আধুনিক বিজ্ঞানের মানদণ্ডে বাইবেল, বেদ ও আল-কোরআন

আধুনিক বিজ্ঞান আজ বহুদূর এগিয়ে গিয়েছে। এখন পৃথিবীর সব কিছুই আলকিত, বিজ্ঞানের এই আলোয় আজ পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে সত্য এবং মিথ্যা। আসুন দেখা যাক পৃথিবীর প্রধান তিনটি ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ এই আধুনিক বিজ্ঞানের আলোর নিচে কাকে কি রূপ দেখায়।

New Bitmap Image

১) মহাবিশ্ব সম্মন্ধেঃ

(ক)বেদঃ

স্বাভাবিক চোখে আকাশকে একটি শক্ত ঢাকনা বা আবরনের মত দেখায় যা আমাদের মাথার উপরে বিরাজ করে। বেদের লেখক এই ভ্রম দিয়েই লিখল অথর্ব্বেদ ১১/৩/১১ এ, “পৃথিবী হচ্ছে চাল সিদ্ধ করার কড়াই আর আকাশ তার ঢাকনা“,
অথচ আজ আমরা জানি পৃথিবী কড়াই এর মত নয়। বরং পৃথিবী দেখতে অনেকটা কমলালেবুর মত।

রিগবেদ মন্ডল ৪ সুক্ত ৪২ মন্ত্র ৩ এ বলা হয়েছে, “ভরুনা আকাশকে বানিয়েছেন শক্ত” । কিন্তু আমরাএখন জানি আকাশ কোনো ঢাকনার মত শক্ত কোন বস্তু নয়।
একি কথা আছে অথর্ববেদ ৬/৪৪/১ এ, তবে সেই সাথে এই মন্ত্রে আরো একটি ভুল আছে, তা হচ্ছে আমরা জানি পৃথিবী গতিশীল,ও তা সুর্যের চারদিকে ঘোরে। কিন্তু এই মন্ত্রে বলা হয়েছে, “পৃথিবী স্থির ও নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে“!!
এই একবিংশ শতাব্দিতে এসে কেউ যদি বলে পৃথিবী স্থির, তাহলে আর কি বলা? বৈদিক ঈশরের নিশ্চয়ই ধারনা ছিল না যে অদুর বা সুদূর ভবিষ্যতে বিজ্ঞান কতখানি এগোবে। একি কথা আবার আছে অথর্ববেদ ১২/১/২৬ এ “পৃথিবী স্থির তার অবস্থান ও তার অক্ষে” এখানে তুলসীরাম একটি বাড়তি ‘অক্ষ’ যুক্ত করেছেন, তবে মুল মন্ত্রে অক্ষ শব্দটা নেই, আর্য সমাজেরই আরেক অনুবাদক দেবীচাঁদ এই মন্ত্রের অনুবাদে লিখেছেন “পৃথিবী দাঁড়িয়ে আছে স্থির তার গুনাবলির কারনে“, আর বেদে যে পৃথিবি স্থির এটা প্রমান হিসেবে বেদাংগেও রয়েছে। বেদাংগ (নিরুক্ত ১০/৩২) সবিতা পৃথিবীকে স্থির করে রেখেছেন খুটি দ্বারা।
এবার দেখুন আকাশ ও পৃথিবী সম্পর্কে বেদের সম্পুর্ন কাল্পনিক ধারনা, খালি চোখে পৃথিবীতে বসে মনে হয় আকাশ উপরে আর পৃথিবী নীচে,তাই বেদ বলছে, অথর্ববেদ ৯/৭/২”আলোর জগত(সৌরজগত) হচ্ছে উপরের চোয়াল আর পৃথিবী হচ্ছে নীচের চোয়াল।”বেদের লেখক জানত না আকাশ আর পৃথিবীর অবস্থান, আকাশ ও পৃথিবীর সাপেক্ষে উপর নীচ বলে কিছুই নেই, পৃথিবীর চারপাশেই সবকিছুই আকাশ।
পৃথিবীতে বসে পৃথিবীকে গোল মনে হয় না, এটাকে মনে হয় একটি লম্বা পথের মত,মানুস ভাবত এই পথ এর নিশ্চয়ই একটি শেষ সীমানা রয়েছে, এজন্যই বেদ লিখেছে,অথর্ববেদ ১৫/৭/১”তিনি চলে গেলেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে“, এই একি কথা আবার আছে রিগবেদ ৭/৮৩/৩ এ, “তিনি তাকালেন পৃথিবীর শেষ প্রান্তে“, এখন যে জিনিস গোল তার শেষ প্রান্ত কি করে হয় ?

বেদ অনুসারে পৃথিবীর রয়েছে নাভি, নাভি বলতে বুঝানো হয় মধ্যস্থান, কিন্তু গোল পৃথিবীর না আছে নাভি না আছে এর মধ্যস্থান। যযুরবেদ ১/১১ তে লেখা আছে, “তিনি(অগ্নিদেবতা) যজ্ঞের বেদী স্থাপন করলেন পৃথিবীর নাভি্দেশে ও আকাশের মধ্যস্থানে“,

yajurved ২৩:১০, এ বলা আছে “সুর্য ঘোরে একা“, অথচ আমরা জানি, সুর্য একা নয় সৌরজগতের সব কিছুই এর সাথে ঘুর্নায়মান।

অথর্ববেদ ১৮/৪/৮৯ তে বলা আছে, “চাঁদ পানির মধ্যে গমন করে আকাশের আলোয়“অর্থাৎ যখন সুর্যের আলো আকাশে আসে, তখন চাঁদ নাকি পানিতে ডুবে।এখন চাঁদ কিভাবে ও কোন জায়গায় পানিতে ডুবে তা বৈদিক গুরুদের উপর ছেড়ে দিলাম। বেদ অনুসারে চাদের রয়েছে নিজস্ব আলো, দেখুন অথর্ববেদ ২/২৩/২ এ O moon the light rays that is yours, একি কথা আছে অথর্ববেদ ২/২৩/৪ এ O moon the light beams that is yours,

বেদ অনুসারে ভগবানের একটা উপমা দেয়া হয়েছে ,অথর্ববেদ ১১/৩/২ এ আছে,”চাঁদ ও সুর্য তার দুটি চোখ” আমরা জানি চাঁদ ও সুর্য দুটি অত্যন্ত অসম আকারের জিনিস, আর চাদের আলো নেই, তাহলে কি ভগবানেরও একটি চোখ অন্ধ ? এই একি কথা আছে গীতার ১১/১৯ নাম্বার মন্ত্রে,”অর্জুন বলছে ক্রিস্নকে চন্দ্র ও সুর্য তোমার দুটি নেত্র” বলাই বাহুল্য অর্জুন ও বেদের লেখকের চাঁদ ও সুর্য সম্পর্কে আসলে কোন ধারনা ছিল না।

অথর্ববেদ ৪/৫/১ এ বলা আছে, “চাঁদ ও সুর্য শুন্যের গভীর থেকে আলো নিয়ে উঠে আসে আবার নিব্রত হয়,থেমে যায় বা বিশ্রামে যায় নিশব্দে” অথচ আমরা জানি চাঁদ সুর্য থামে না বা নিব্রতও হয় না, এটি ক্রমাগত চলতে থাকে, বেদের লেখক প্রথিবীর প্রস্টে যখন চাঁদ সুর্য অবস্থান করেছে সে ভাবছে বোধহয় তা থেমে আছে। রিগবেদ খন্ড ১, সুক্ত ৬৪ মন্ত্র ২ বলছে, ‘The winds which belong to collective prana are born from the sky’. তুলসী রাম একটু ভিন্ন লিখেছে, সে লিখেছে , ‘Wind is the son of sky‘, কথা আলাদা হলেও অর্থ একই। অথচ আমরা জানি, আকাশ বা মহাশুন্য হচ্ছে বায়ুশুন্য এরিয়া, এখানে বলা হয়েছে collective prana অর্থ হচ্ছে সমস্টিগত প্রান। এই লাইন্টির অর্থ হচ্ছে, যে বায়ু সকল প্রকার প্রানের জন্য, তার জন্ম আকাশে।কিন্তু আমরা এখন জানি , প্রানের জন্য বায়ু্র উপাদান হচ্ছে অক্সিজেন। আর অক্সিজেন সম্রদ্ধ বায়ু তৈরি হয় প্রথিবিতে উদ্ভিদের মাধ্যমে। আকাশে নয়। শতকরা ৯০ ভাগ অক্সিজেন তৈরী হয় সমুদ্র প্রস্টের উদ্ভিদ থেকে। প্রথিবি থেকে যত উপরে ওঠা যায় এর পরিমান ততই কমতে থাকে। মহাশুন্যে অক্সিজেন এর পরিমান জিরো।কিন্তু এটি সেসময়ের মানুসের জানা ছিল না। তাই বেদ এর লেখক যেহেতু সর্বশক্তিমান স্রস্টা নয় তাই সেও এটা জানত না।

(খ) বাইবেলঃ

বাইবেল বলেছে এই মহা বিশ্ব ছয় দিনে(২৪ ঘন্টার দিন হিসেবে) সৃষ্টি হয়েছে। আসুন দেখি এই ছয় দিনে গড কিভাবে, কি কি সৃষ্টি করলেন।
The Creation:
DAY 1 : In the beginning, God created the heavens and the earth. When the earth was unformed and desolate, with the surface of the ocean depths shrouded in darkness, and while the Spirit of God was hovering over the surface of the waters, God said, “Let there be light!” So there was light. God saw that the light was good. He separated the light from the darkness, calling the light “day,” and the darkness “night.” The twilight and dawn were day one.[Book of Genesis, ch:1; Vers:1-5]
>> স্টিফেন হকিং এর বিগ ব্যাং তত্ত্ব বলে পৃথীবি সূর্যের অংশ। কিন্তু এখানে বাইবেল বলছে সূর্য সৃষ্টির আগেই পৃথীবি সৃষ্টি হয়েছে এবং সম্পূর্ন পৃথিবী প্রথমে পানিতে নিমজ্জিত ছিল। এমন কি এখানে সুর্য ছাড়া দিন এবং রাত্রি সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। যা কিনা বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। উতস (সূর্য) ছাড়া পৃথিবী তে আলো আসে কিভাবে??

DAY 2 : Then God said, “Let there be an expanse between the waters, separating water from water!” So God made the expanse, separating the water beneath the expanse from the water above it. And so it was. God called the expanse “sky.” The twilight and the dawn were the second day. [Book of Genesis, ch:1; Vers:6-8]
>> ২য় দিন পৃথিবীর পানিকে দুভাগ করে একভাগ পৃথিবীতে এবং অপর ভাগ আকাশে রাখলেন।

DAY 3: Then God said, “Let the water beneath the sky come together into one area, and let dry ground appear!” And so it was. God called the dry ground “land,” and he called the water that had come together “oceans.” And God saw how good it was. Then God said, “Let vegetation sprout all over the earth, including seed-bearing plants and fruit trees, each kind containing its own seed!” And so it was: Vegetation sprouted all over the earth, including seed-bearing plants and fruit trees, each kind containing its own seed. And God saw that it was good. The twilight and the dawn were the third day [Book of Genesis, ch:1; Vers:9-13]
>> ৩য় দিন সৃষ্টি হল স্থল ভাগ, মহাসাগর। এবং সারা পৃথিবীতে সকল প্রকার উদ্ভিদ ও গাছ পালাতে ফলমূলে ভরে উঠলো। অথচ তখনো সূর্য সৃষ্টি হয়নি, আর গাছপালা জন্মানোর জন্য সুর্যের আলো দরকার যা কিনা বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য।

DAY 4: Then God said, “Let there be lights in the expanse of the sky to distinguish day from night, to act as signs for seasons, days, and years, to serve as lights in the expanse of the sky, and to shine on the earth!” And
so it was. God fashioned two great lights—the larger light to illumine the day and the smaller light to illumine the night—as well as the stars. God placed them in the
expanse of the sky to shine on the earth, to illumine both day and night, and to distinguish light from darkness. And God saw how good it was. The twilight and the dawn were the fourth day.[Book of Genesis, ch:1; Vers:14-19]
>> ৪র্থ দিন ঈশ্বর বছর, মাস ও দিন বুঝার জন্য তৈরি করলেন তারা। তারপর তৈরি করলেন সূর্য এনং চাদ নামক দুটি মহাজ্যোতি। সূর্য দিনের বেলা আকাশ কে এবং চাদ রাতের বেলা আকশকে আলোকিত রাখবে। এখানে সূর্য কে বলা হয়েছে বড় তারা এবং চাদ কে বলা হয়েছে ছোট তারা। অর্থাৎ বলা হচ্ছে চাদের নিজস্ব আলো আছে, যা কিনা বৈজ্ঞানিকভাবে অসত্য।

>> ৫ম দিন সৃষ্টি করলেন মাছ ও পাখি।
>> ৬ষ্ঠ দিন তৈরি করলেন ডাঙ্গার প্রানি এবং মানুষ।
এভাবে বাইবেলের বর্ননা অনুসারে ঈশ্বর ৬ দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেন। যেখানে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ন অবৈজ্ঞানিক।

অরো অন্যান্য ভুল নিচে দেয়া হলঃ

১। মহাকাশ কি পিলারের ঊপর দাঁড়িয়ে আছে??
“The pillars of the heavens tremble”
“ভূগর্ভস্থ থামগুলি যা আকাশকে ধারন করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।”[ Book of Job: 26:11]
কিন্তু বিজ্ঞান বলে, মহাকাশের কোন পিলার নেই মহাকাশ শূন্যে ভাসমান।

২। পৃথিবী ধ্বংস হবে কি হবে না??
“Heaven & Earth will come to an end, but you will remain forever.”
“মহাবিশ্ব এবং পৃথিবী ধ্বংস হবে, কিন্তু তোমরা (মানুষ) চিরকাল থাকবে।”
[Book of Hebrew: 1:11]

“A generation goes, a generation comes, but the earth remains forever.”
“যুগ যাবে যুগ আসবে, কিন্তু পৃথিবী চিরকাল থাকবে।”
[ Book of Ecclesiastes: 1:4]
> এখন প্রশ্ন হচ্ছে পৃথিবী কি চীরকাল থাকবে নাকি একদিন ধ্বংস হবে?? কোনটি কে সত্য বলে মেনে নিব??
বিজ্ঞান বলে, পৃথিবী এক দিন ধ্বংস হবে।

৩। পৃথিবী পিলারের ঊপর দাঁড়িয়ে??
“Indeed the pillars of the earth belong to the LORD”
“পৃথিবীর থামগুলো ঈশ্বরের অধীনে”
[First Book of Samuel: 2:8]
>> বিজ্ঞান বলে, পৃথিবী শূন্যে ভাসে আছে, এর কোন পিলার নেই।

(গ) আল কোরআন

বিশ্ব সৃষ্টি ও মহা বিস্ফোরণ (বিগ ব্যাংগ)

বিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কে জ্যোতিবিদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা ব্যাপকহারে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে নভোচারী ও জ্যোতিবিদদের সংগৃহীত ও পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষামূলক উপাত্ত দ্বারাও তা সমর্থিত হয়েছে। মহা বিস্ফোরণ তত্ত অনুযায়ী মহাবিশ্ব ছিল প্রথমে একটি বিশাল নীহারিকা। পরে ২য় পর্যায়ে তাতে এক বিরাট বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে ছায়া পথ তৈরী হয়। এগুলো পরে তারকা, গ্রহ, সূর্য ও চন্দ্র ইত্যাদিতে রুপান্তরিত হয়। বিশ্বের সূচনা বিষ্ময়কর এবং দৈবক্রমে তা ঘটার সম্ভাবনা শূন্য পর্যায়ে।

পবিত্র কোরআন মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতে বলেছে,

“কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মূখ বন্ধ ছিল, তারপর আমি ঊভয়কে খুলে দিলাম।” – সূরা আম্বিয়া-৩০

ছায়াপথ সৃষ্টির আগে প্রাথমিক গ্যাস পিন্ড

বিজ্ঞানীরা একমত যে ,মহা বিশ্বে ছায়াপথ তৈরীর আগে আকাশ সম্পর্কিত পদার্থগুলো গ্যাস জাতীয় জিনিস ছিল।সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিপুল সংখ্যক গ্যাসজাতীয় পদার্থ কিংবা মেঘ, ছায়া পথ তৈরীর আগে বিদ্যমান ছিল।আকাশ সম্পর্কিত প্রাথমিক পদার্থকে গ্যাস অপেক্ষা ধুঁয়া বলা বেশী সঙ্গত।কোরআন মজীদ ধুঁয়া দ্বারা মহাবিশ্ব সৃষ্টির ঐ অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ

“তার পর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা কিছু ধূঁম্রকুঞ্জ, অতঃপর তিনি তাকে ও পৃথিবী বললেন, তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তারা বলল আমরা সেচ্ছায় আসলাম। – সূরা হা-মীম সাজদাহ-১১

এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, এ অবস্থায় মহাবিস্ফোরণেরই ফল এবং মহানবী মোহাম্মদ (ছঃ) এর আগে এ বিষয়টি কারো জানা ছিল না।তাহলে প্রশ্ন জাগে, এ জ্ঞানের উৎস কি ?

পৃথিবীর আকার গোল

প্রথম যুগে মানুষ বিশ্বাস করত যে, পৃথিবী চেপ্টা ছিল।বহু শতাব্দী ব্যাপী মানুষ দূরে সফরে যেতে ভয় পেত কি জানি পৃথিবীর কিনারা থেকে পড়ে যায় কিনা।স্যার ফ্রনকিস ড্র্যাক প্রথম প্রমান করেন যে, পৃথিবী গোলাকার । তিনি ১৫৯৭ সনে পৃথিবীর চারপাশে নৌভ্রমন করেন।আমরা দিবা রাত্রির আবর্তনের ব্যাপারে কোরআনের নিন্মোক্ত আয়াতটি বিবেচনা করতে পারি।

“আপনি কি দেখেনা আল্লাহ রাতকে দিনের মধ্যে এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান? -সূরা লোকমান – ২৯

অর্থাৎ রাত আস্তে আস্তে এবং ক্রমান্বয়ে দিনে রূপান্তরিত হয়, অনুরূপভাবে দিন ও আস্তে আস্তে এবং ক্রমান্বয়ে রাতে পরিবর্তিত হয়। পৃথিবী গোলাকৃতির হলেই কেবল এ ঘটনা ঘটতে পারে ।

নিম্নের আয়াত দ্বারাও পৃথিবী যে গোলাকার তা বুঝা যায়্‌ আল্লাহ বলেনঃ

তিনি আসমান ও জামিন কে সৃষ্টি করেছেন যথার্থভাবে। তিনি রাতকে দিন দ্বারা আচ্ছাদিত করেন এবং রাত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন।” সূরা যোমর -৫

আয়াতে ব্যবহৃত (আরবী) শব্দের অর্থ হলো কুন্ডলী পাকানো বা কোন জিনিসকে প্যাঁচানো । যেমন করে মাথায় পাগড়ী প্যাঁচানো হয়। রাত ও দিনের আবর্তন তখনই সম্ভব যখন পৃথিবী গোলাকার হয়।

পৃথিবী বলের মত গোলাকার নয়, বরং মেরুকেন্দ্রিক চেপ্টা।

নিম্নের আয়াতে পৃথিবীর আকৃতির বর্ননা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন,

“তিনি পৃথিবীকে এর পরে বিস্তৃত করেছেন।” সূরা নাযিআত -৩০

আরবী শব্দ এর দুটো অর্থ আছে। একটি অর্থ হলো উঠপাখির ডিম।উটপাখীর ডিমের আকৃতির মতই পৃথিবীর আকৃতি মেরুকেন্দ্রিক চেপ্টা । অন্য অর্থ হল ‘সম্প্রসারিত করা’। উভই অর্থই বিশুদ্ধ।

কোরআন এভাবেই পৃথিবীর আকৃতি বিশুদ্ধভাবে বর্ণনা করেছে।অথচ যখন কোরআন যখন নাযিল হয় তখন প্রচলিত ধারনা ছিল পৃথিবী হচ্ছে চেপ্টা।

চাঁদের আলো হচ্ছে প্রতিফলিত আলো

আগের সভ্যতা গুলোর ধারণা ছিল,চাঁদের নিজস্ব আলো আছে।কিন্তু বিজ্ঞান বর্তমানে আমাদেরকে বলে যে,চাঁদের আলো হচ্ছে প্রতিফলিত আলো।এ সত্যটি কোরআন আমাদেরকে আজ থেকে ১৪শ বছর আগে বলেছে।আল্লাহ বলেনঃ

“কল্যাণময় তিনি, যিনি নভোমণ্ডলকে রাশিচক্র সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে রেখেছেন সূর্য ও দীপ্তিময় চন্দ্র।”- সূরা ফুরকান-৬১

আরবীতে সূর্যকে (আরবী ) বলে।কোরআনে (আরবী )শব্দ দ্বারাও সূর্য বুঝানো হয়েছে।এর অর্থ হল,বাতি বা র্মশাল।অন্য জায়গায় ,সূর্যকে (আরবী) উল্লেখ করা হয়েছে।এর অর্থ হল ‘জ্বলন্ত কিরণোজ্জল বাতি বা মশাল।’অন্য আরেক জায়গায়, একই অর্থ বুঝানোর জন্য (আরবী ) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।এর অর্থ হল ‘কিরণোজ্জল সূর্য ’।এই তিনটি বর্ণনাই সূর্যের উপযোগী।কেননা,সূর্য নিজ দহনক্রিয়ায় ব্যাপক তাপ ও আলো উৎপাদন করে।

চাঁদের আরবী প্রতিশব্দ হল (আরবী ) কোরআন চাঁদকে (আরবী ) বলেছে।এর অর্থ হল‘ স্নিগ্ধ আলোদানকারী।’অর্থাৎ প্রতিফলিত আলো দেয়।কোরআনের বর্ণনা চাঁদের আসল প্রকৃতির সাথে খাপ খায়।চাঁদ নিজ থেকে আলো দেয় না।বরং তা এমন এক নিষ্ক্রীয় জিনিস যার উপর সূর্যের আলোর প্রতিবিম্ব ঘটে।কোরআনে কখনও চাঁদকে (আরবী )কিংবা (আরবী ) বলা হয়নি এবং সূর্যকেও (আরবী )কিংবা (আরবী ) বলা হয়নি।

এর দ্বারা বুঝা যায় যে,কোরআন সূর্য ও চাঁদের আলোর মধ্যকার পার্থক্যকে স্বীকার করে।

নিম্নের আয়াত,চাঁদ ওসূর্যের আলোর প্রকৃতি উল্লেখ করেছে।আল্লাহ বলেনঃ

“তিনিই সত্তা যিনি সূর্যকে কিরণোজ্জল এবং চাঁদকে স্নিন্ধ আলোয় আলোকিত করেছেন।”সুরা ইউনুস-৫

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরো বলেনঃ

“তোমরা কি লক্ষ্য করনা যে,আল্লাহ কিভাবে সাত আকাশ স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন,সেখানে চাঁদকে রেখেছেন স্নিন্ধ আলোরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে ?”- সুরা নূহ-১৫-১৬

মহান কোরআন এবং আধুনিক বিজ্ঞান চাঁদ ও সূর্যের আলোর ব্যবধানের ব্যাপারে অভিন্ন কথা বলে।

সূর্যের আবর্তন

দীর্ঘদিন ব্যাপী ইউরোপীয় দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করত যে,পৃথীবি মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থিত এবং সূর্য সহ অন্যান্য জিনিসগুলো একে কেন্দ্র করে চারদিকে ঘুরে।এ ভূকেন্দ্রিক ধারণা,পাশ্চাত্যে খৃষ্টপৃর্ব ২য় শতাব্দীতে টলেমীর যুগ থেকে বিদ্যামান ছিল।১৫১২ খৃঃ নিকোলাস কোপারনিকাস গ্রহের গতি আছে মর্মে- সূর্যকেন্দ্রিক তত্ব দেন।এই তত্বে বলা হয়,সৌরজগতের কেন্দবিন্দু- সূর্য গতিহীন।কিন্তু অন্যান্য গ্রহগুলো একে কেন্দ্র করে চারদিকে ঘুরে।

১৬০৯ খৃঃ জার্মান বিজ্ঞানী ইউহান্নাস কেপলার ‘Astronomia Nova’নামক একটি বই প্রকাশ করেন।তিনি তাতে মত প্রকাশ করেন যে, গ্রহগুলো শুধুমাত্র সূর্যের চারদিকে ডিম্বাকৃতির কক্ষপথেই চলে না,বরং সেগুলো নিজ নিজ কক্ষপথে অনিয়মিত গতিতে আবর্তিত হয়।এ জ্ঞানের আলোকে ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের পক্ষে সৌরজগতের বহু বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হয়েছে,যার মধ্যে দিন রাতের বিষয়টি অন্যতম।

এসকল আবিষ্কারের পর ধারনা করা হয় যে, সূর্য স্থিতিশীল যা পৃথিবীর মত নিজ কক্ষপথে আবর্তন করে না।আমি স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় ভুগোলে এ ভুল মতটি পড়েছি বলে মনে পড়ে।

আমরা এখন কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি ব্যাখ্যা করবো।আল্লাহ বলেনঃ

“তিনি সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং চাঁদ-সূর্য। সবাই আপন আপন কক্ষপথে বিচরণ করে।” (সূরা আম্বিয়া -৩৩)

এ আয়াতে (আরবী)শব্দটি ব্যবহূত হয়েছে যা (আরবী) থেকে এসেছে। শাব্দিক অর্থ সাঁতার কাটা। এ শব্দটি কোন জিনিসের গতি বুঝানোর জন্য ব্যবহূত হয়। আপনি যমীনে কোন ব্যাক্তির জন্য এ শব্দটি ব্যবহার করলে এর অর্থ এটা নয় যে, তিনি গড়াগড়ি দিচ্ছেন। বরং এর অর্থ হবে তিনি হাটেন বা দৌড়ান।আর পানিতে অবস্থানকারী কোন ব্যক্তির জন্য ব্যবহার করলে এর অর্থ তিনি ‘ভাসেন’ হবে না, বরং এর অর্থ হবে, তিনি সাঁতার কাটেন।

অনুরূপভাবে আপনি যদি শব্দটি আকাশ সম্পকির্ত কোন জিনিস,যেমন সূর্য সম্পর্কে ব্যবহার করেন,তখন এর অর্থ শুধু মহাশূন্যে উড়া নয়,বরং এর অর্থ হল,তা মহাশূন্যে আবর্তিত হয়। স্কুলের অধিকাংশ পাঠ্যপুস্তকে এ সত্যটি উল্লেখ আছে যে,সূর্য নিজ কক্ষপথে ঘুরে। সূর্যের নিজ কক্ষে আবর্তনকে বুঝার জন্য টেবিলের উপরে সূর্যের প্রতিকৃতি প্রদর্শন করা দরকার। চোখ বাঁধা না হলে যে কেউ সূর্যের প্রতিকৃতিটি পরীক্ষা করতে পারে। দেখা গেছে,সূর্যের রয়েছে অবস্থান স্থলসমূহ যা প্রতি ২৫দিনে একবার আবর্তন করে থাকে। অর্থাৎ নিজ কক্ষপথে আবর্তন করতে সূর্যের প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে।

সূর্য প্রতি সেকেন্ডে মহাশূনে ২৪০ কিলোমিটার গতিতে চলে। আমাদের ছায়াপথের কেন্দ্রে একবার তার আবর্তন করতে ২০০ মিলিয়ন বছর সময় লাগে।

আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেনঃ

“সূর্য নাগার পেতে পারে না চাঁদের এবং রাত আগে চলে না দিনের। প্রত্যেকেই আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণ করে।” সূরা ইয়াসিন -৪০

এ আয়াতে এমন সব বৈজ্ঞানিক সত্য রয়েছে, যা মাত্র সম্প্রতি আধুনিক জ্যোতিষ শাস্ত্র আবিষ্কার করেছে। সেগুলো হল,চাঁদ ও সূর্যের স্বতন্ত্র কক্ষপথ আছে এবং সেগুলো নিজস্ব গতিতে মহাশূন্যে ভ্রমন করছে।

সূর্য সৌরজগতকে নিয়ে যে নির্দ্দিষ্ট স্থানের দিকে চলছে,সে স্থানটি আধুনিক জ্যোতিষশাস্ত্র সুনির্দ্দিষ্টভাবে আবিষ্কার করেছে। এর নামকরণ করা হয়েছে সৌর শৃঙ্গ বা (Solar Apex )। সৌরজগত মহাশূন্যে যে দিকে ধাবিত হয়,সে দিকটির অবস্থান বর্তমানে যথার্থ ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সেটি হল বৃহদাকারের এক গ্রুপ তারকা। Consellation of Hercules(Alpha Lyrae )

চাঁদ নিজ কক্ষপথে অতটুকু সময়ে একবার আবর্তন করে,পৃথিবীর চারদিক ঘুরতে যতটুকু সময় লাগে। একবার ঘুরে আসতে তার সাড়ে ২৯ দিন সময় লাগে।

কোরআনের আয়াতের বৈজ্ঞানিক যথার্থতা সম্পর্কে যে কেউ আশ্চর্য না হয়ে পারেনা। আমাদের কি এ প্রশ্নের উপর চিন্তা করা উচিত নয় যে,কোরআনের জ্ঞানের উৎস কি?

সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে যাবে

বিগত ৫ বিলিয়ন বছর ব্যাপী রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সূর্যের দেহে তাপ সৃষ্টি হচ্ছে। ভবিষ্যতে এক সময়ে এর অবসান ঘটবে এবং তখন সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। ফলে পৃথিবীর সকল অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে।সুর্যের অস্থায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেনঃ

“সূর্য তার নির্দ্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশ্যালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ” (সূরা ইয়াসিন-৩৮) অনূরূপ বর্ণনা সূরা রাদ- এর ২নং আয়াত, সূরা ফাতের এর ১৩নং আয়াত, সূরা যোমারের ৫নং আয়াত ও ২১নং আয়াতে আছে।

এখানে উল্লেখিত (আরবী)শব্দটির অর্থ হল‘নির্দ্দিষ্ট স্থান’ বা ‘সময়’। কোরআন বলেছে,সূর্য একটা নির্ধারিত স্থানের দিকে আবর্তিত হচ্ছে যা একটা নির্দ্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এর অন্য অর্থ হল,একদিন তার অবসান ঘটবে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন (আরবী) ‘যখন সূর্য নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। (সূরা তাকবীর-১)সূর্যের নিষ্প্রভ হওয়া কেয়ামতের লক্ষণ।

মহাশূন্যে বস্তুর অস্তিত্ব

সুসংগঠিত সৌরজগতের বাইরের স্থানকে প্রথমে শুণ্য মনে করা হত। জ্যোতির্বিদরা পরবর্তীতে মহাশুন্যে বস্তুর সেতু আবিষ্কার করেন। বস্তুর সেতুকে প্লাজমা বলে,যাতে পারমানবিক গ্যাস রয়েছে এবং তাতে সমান সংখ্যক মুক্ত ইলেকট্রন ও ইতিবাচক পরমাণু আছে। কোন কোন সময় প্লাজমাকে বস্তুর ৪র্থ অবস্থা বলে। অন্য তিনটি অবস্থা হল,কঠিন তরল এবং বায়বীয়। কোরআন নিম্নের আয়াতে মহাশুন্যের ঐ বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে কথা বলেছে। আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) “তিনি সে সত্তা যিনি আসমান ও যমীন এবং এ দুয়ের মাঝে অবস্থিত সকল সৃষ্টি করেছেন। সূরা ফোরকান-৫৯

১৪০০ বছর আগে মহাশূন্যে সৌর বস্তুর জ্ঞান অস্তিত্বের জ্ঞান সম্পর্কে বললে যে কেউ তা উপহাস করতে পারে।

সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্ব

১৯২৫খৃঃ জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবেল পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণের সাহায্যে বলেছেন,প্রতিটি ছায়াপথ অন্য ছায়াপথ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে। এর অপর অর্থ হল,মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ এখন বৈজ্ঞানিক সত্য। কোরআন মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে একই কথা বলেছে।আল্লাহ বলেনঃ

“আমি নিজ ক্ষমতা বলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই এর সম্প্রসারণকারী।”সূরা যারিয়াত-৪৭

আরবী শব্দ (আরবী) এর বিশুদ্ধ অনুবাদ হল,‘সম্প্রসারণকারী।’ এটা মহাবিশ্বের ব্যাপক সম্প্রসারণশীলতার প্রতি ইঙ্গিতবাহী।

প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ স্টিফেন হকিং তার A Brief History of time বইতে লিখেছেন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ সম্পর্কিত আবিষ্কার বিংশ শতাব্দীর মহান বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব। মানুষ কর্তৃক টেলিষ্কোপ আবিষ্কারের পূর্বে কোরআন মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছে।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, আরবরা যেহেতু জ্যোতির্বিদ্যায় অগ্রসর ছিল, সেহেতু কোরআনে জ্যোতিবিজ্ঞান সম্পর্কিত সত্যের উল্লেখ আশ্চর্যের বিষয় নয়। জ্যোতির্বিদ্যায় আরবদের অগ্রসরতার প্রতি তাদের স্বীকৃতি সত্য বটে। কিন্তু জ্যোতির্বিদ্যায় আরবদের অগ্রসরতার কয়েক শতাব্দী পূর্বে কোরআন নাযিল হয়েছিল। অধিকন্তু আরবরা তাদের বৈজ্ঞানিক শৌর্যবীর্যের সময়ে ও উল্লিখিত বিগ ব্যাং -এর মাধ্যমে মহাবিশ্বের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছু জানত না। জ্যোতির্বিদ্যার অগ্রগতির কারণে কোরআনে বর্ণিত বৈজ্ঞানিক সত্যগুলোতে আরবদের কোন অবদান ছিল না। বরং বিপরীতটাই সত্য। আর তা হল,তারা জ্যোতির্বিদ্যায় এজন্য অগ্রগতি অর্জন করেছে যে, কোরআনে জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কে আলোচনা স্থান পেয়েছে।

২) মানব দেহ ও ভ্রুণবিদ্যা সম্মন্ধেঃ

(ক) বেদ

মানব দেহের সৃষ্টি তথা ভ্রূণবিদ্যা বিষয়ে বেদে একটি আলোচনাও নেই। তবে বেদের মতে এই মহাবিশ্বের প্রথম জীব ব্রহ্মা।

“আমার নির্দেশ অনুসরণ করিয়া, পূর্ণ বৈদিক জ্ঞানের দ্বারা এবং সর্ব কারণের পরম কারণ আমার থেকে সরাসরিভাবে তুমি যে দেহ প্রাপ্ত হইয়াছ, তাহার দ্বারা তুমি এখন পূর্বের মতো প্রজা সৃষ্টি কর ।” – ভাগবত ৩/৯/৪৩

তাহলে বুঝা গেল সৃষ্ট জীব নিজেই জীবন সৃষ্টি করেছেন !

(খ) বাইবেল

Leveticus, Ch. No.12, Verse No.1 to 5 এ বলা আছে, “After a woman gives birth to a male child, she will be unclean for 7 days, and the period of uncleanliness will continue for 33 days more. If she gives birth to a female child, she will be unclean for two weeks, and the period of uncleanliness will continue for 66 days.”
তাহলে দাঁড়াচ্ছে একজন মা যদি একটি ছেলে সন্তানের জম্ম দেয়, সে অশুচি থাকে ৪০ দিন এবং সন্তান মেয়ে হলে থাকে ৮০ দিন ! অথচ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে সন্তান ছেলে হোক অথবা মেয়ে হোক, প্রসব পরবর্তী এই অশুচি কোনো ভাবেই সন্তানের লিঙ্গের উপর নির্ভর করেনা।

(গ) আল কোরআন

রক্তচলাচল এবং দুধ

পবিত্র কোরাআন মুসলিম বিজ্ঞানী ইবনে নাফীসের ৬০০ বছর আগে এবং পশ্চিমা বিশ্বে উইলিয়াম হারওয়ে কর্তৃত রক্ত চলাচলের ধারণা দেয়ার ১ হাজার পূর্বে,নাযিল হয়েছে।১৩০০ বছর আগে,অন্ত্রনালীতে কি ঘটে,তা জানা যায়।জানা যায় যে,শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ হজম বা বিপাকীয় প্রক্রিয়ার লালিত হয়।পবিত্র কোরআন মজীদের এক আয়াতে দুধের উপাদানের উৎসের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে,তা এর সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এ ব্যাপারে কোরআনের আয়াত বুঝতে হলে,আগে জানতে হবে যে,অন্ত্রনালীতে কি কি রাসায়নিক প্রক্রিয়া ঘটে এবং সেখান থেকে অর্থাৎ খাদ্যের নির্যাস কি করে একটি জটিল প্রক্রিয়ায় রক্তে প্রবাহিত হয়।রাসায়নিক প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে তা যকৃতের মাধ্যমে সরবরাহ হয়।রক্ত সে গুলোক শরীরের প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সরবরাহ করে।এর মধ্যে দুধ উৎপাদনকারী স্তন সম্বন্ধীয় গ্রন্থি অন্যমত।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে বলা যায় যে,অন্ত্রনালীর কিছু সুনির্দ্দিষ্ট নির্যাস,অন্ত্রনালীর দেয়ালের পাত্রে প্রবেশ করে এবং রক্ত প্রবাহের ফলে সে সকল নির্যাস বিভিন্ন অঙ্গে সরবরাহ হয়।

আমরা নিম্নের আয়াতটিতে শারীরতত্ব বিষয়ক বর্ণনার প্রশংসা করতে পারি।

মহান আল্লহ বলেনঃ

“এবং তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুসমূহের চিন্তা করার বিষয় রয়েছে।আমি তোমাদেরকে পান করাই তাদের উদরস্থিত বস্তুসমূহের মধ্য থেকে গোবর ও রক্ত নিঃসৃত দুধ যা পানকারীদের জন্য উপকারী।”সূরা আন নাহল-৬৬

আল্লাহ আরো বলেনঃ

“এবং তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তসমূহের মধ্যে চিন্তা করার বিষয় রয়েছে।আমি তোমাদেরকে তাদের উদরস্থিত বস্তু থেকে পান করাই এবং তোমাদের জন্য তাদের মধ্যে রয়েছে প্রচুর উপকারিতা।তোমরা তাদের কিছুকে ভক্ষণ কর।”সরা আল মুমিনুন-২১

১৪০০ বছর আগে গবাদি পশুর দুধ তৈরির ব্যাপারে কোরআনের বর্ণনা সাম্প্রতিককালে শারীরতত্ব বিদ্যার আবিষ্কারের মতই অভিন্ন।

১১. ভ্রুণতত্ব

মুসলমানরা উত্তর চায়

একদল মুসলিম পণ্ডিত ইয়েমেনের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ শেখ আবদুল মজীদ যিন্দানীর নেতৃত্বে পবিত্র কোরআন মজীদ এবং বিশুদ্ধ হাদীস থেকে ভ্রূণতত্ব সহ অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে তা ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন।ভ্রূণতত্ব বলতে বুঝায়,জন্মের পূর্বে মানুষের বিকাশ সম্পর্কিত বিদ্যা।এ ক্ষেত্রে তারা কোরআনের নিম্নোক্ত উপদেশকে সামনে রেখেছেন।

“অতএব জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস কর,যদি তোমাদের জানা না থাকে – সূরা আল নহল -৪৩ -সূরা আল আম্বিয়া -৭

কোরআন এবং হাদীসে ভ্রূণতত্ব সম্প্রর্কিত বর্ণনাগুলোকে একত্রিত করে ইংরেজীতে অনুবাদের পর কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্রূণতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান এবং বর্তমান যুগে ভ্রূণতত্বে সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডঃ কেইথ মুরকে সেগুলোর ব্যাপারে মন্তব্য করতে বলা হয়।ডঃ মুর ভালভাবে সেগুলো অধ্যায়নের পা বলেনঃ কোরআন ও বিশুদ্ধ হাদীসে ভ্রূণতত্ব সম্পর্কে যা এসেছে,ভ্রূণবিদ্যার ক্ষেত্রে আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাথে সেগুলোর অধিকাংশের পূর্ণ মিল রয়েছে,কোন বেমিল বা বৈসাদৃশ্য নেই।তিনি কিছু সংখ্যক আয়াতের মর্মের যথার্থতা সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেননি।তিনি সেগুলোর বক্তব্য সত্য না মিথ্যা বলতে পারছেন না।কেননা সে তথ্যগুলো সম্পর্কে তিনি নিজেও ওয়াকিফহাল নন।আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যায় বা লেখায় সেগুলোর কোন উল্লেখ দেখা যায়না।এরকম একটি আয়াত হলঃ

“পড় তোমার প্রভূর নামে,যিনি সৃষ্টি করেছেন।তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।”সূরা আলাক -১-২

আরবী ভাষায় (আরবী )শব্দের অর্থ হল,জমাট রক্ত।এর অপর অর্থ হল,দৃঢ়ভাবে আটকে থাকে এমন আঠলো জিনিস।যেমন.জোঁক কামড় দিয়ে আটকে থাকে।

ডঃমুর জানেন না যে,প্রাথমিক অবস্থায় ভ্রূণকে কি জোঁকের মত দেখায়?তিনি এটা যাঁচাই করার জন্য এক শক্তিশালী মাইক্রোস্কোফের সাহায্যে ভ্রূণের প্রাথমিক অবস্থা গবেষণা করেন এবং বলেন যে,ভ্রূণের চিত্র দেখতে জোঁকের আকৃতির মত।তিনি এ দু’টোর মধ্যে অদ্ভুত সামঞ্জস্য দেখে অভিভূত হয়ে যান।এবইভাবে,তিনি ভ্রূণতত্ব সম্পর্কে কোরআন থেকে আরো বেশী জ্ঞান অর্জন করেন যা তাঁর জানা ছিল না।ডঃমুর কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত ভ্রণতত্ব সম্পর্কিত ৮০টি প্রশ্নের জবাব দেন।তিনি বলেন,কোরআন ও হাদীসে উল্লেখিত তথ্যগুলো ভ্রূনতত্ব সম্পর্কে সর্বশেষ আবিষ্কৃত তথ্যের সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল।তিনি আরো বলেন,আমাকে যদি আজ থেকে ৩০ বছর আগে এ সকল প্রশ্ন করা হত,তাহলে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের অভাবে আমি সে গুলোর অর্ধেকেরও উত্তর দিতে পারতাম না।

তিনি সৌদী আরবের দাম্মামে,১৯৮১ সালে অনুষ্ঠিত এক চিকিৎসা সম্মেলনে বলেন,কোরআনে মানুষের বিকাশ সম্পর্কিত বর্ণনার ব্যাখ্যা করার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত।এটা আমার কাছে পরিষ্কার যে,মোহাম্মদের কাছে এ সকল বর্ণনা আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে।কেননা,পরবর্তী বহু শতাব্দী পরেও এর অধিকাংশ জ্ঞান আবিষ্কৃত হয়নি।এর দ্বারা আমার কাছে একথা প্রমাণিত যে,মোহাম্মদ অবশ্যই আল্লাহর নবী।

ডঃকেইথ মুর আগে ‘The Developing Human’ নামক একটা বই লিখেছিলেন।কিন্তু কোরআন থেকে জ্ঞান সংগ্রহের পর তিনি তার ঐ বইয়ের ৩য় সংস্করণ প্রকাশ করেন।বইটি একক লেখকের সর্বোত্তম চিকিৎসা বই হিসেবে পুনষ্কার লাভ করে।বইটি বিশ্বের বড় বড় অনেক ভাষায় অনুদিত হয়েছে এবং ১ম বর্ষের মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের জন্য ভ্রূণবিদ্যায় পাঠ্যবই হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

আমেরিকার হিউষ্টনে বেলর কলেজ অব মেডিসিনের ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগের চেয়ারম্যান ডঃজোয়লিগ সিম্পসন ঘোসণা করেন যে,‘৭ম শতাব্দীতে,বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক গৃহীত হয়নি।কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল যে,ধর্মের (ইসলামের )সাথে জন্ম সংক্রান্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোন বিরোধ নেই।অধিকন্তু ধর্ম অর্থাৎ ইসলাম তার অবতীর্ণ জ্ঞান দিয়ে কিছু প্রচলিত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গীকে পথ প্রদর্শন করতে পারে।——– কোরআনের বর্ণনাগুলো পরবতী শতাব্দী গুলোতে যর্থাথ প্রমাণিত হয়েছে।এর দ্বারা একথার সমর্থন পাওয়া যায় যে, কোরআনের জ্ঞান আল্লাহ প্রদত্ত।”

মেরুদন্ড ও পাঁজরের মাঝ থেকে নিক্ষিপ্ত ফোঁটা

মহান আল্লাহ বলেনঃ

অতএব, মানুষের দেখা উচিত কি বস্তু থেকে সে সৃজিত হয়েছে।সে সৃজিত হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে।এটা নির্গত হয় মেরুদণ্ড বক্ষপাঁজরের মাঝ থেকে।(সূরা তারেক -৫-৭)

জন্মপূর্ব বিকাশের স্তরে,পুরুষ ও নারীর জনেন্দ্রীয়গুলো,অর্থাৎ পুরুষের অন্ডকোষ এবং নারীর ডিম্বাশয়,কিডনীর কাছে মেরুদণ্ড স্তম্ভ এবং ১১শ ও ১২শ বক্ষপাঁজরের মাঝে বিকশিত হয়।তারপর সেগুলো নীচে নেমে আসে।নারীর ডিম্বাশয় তলপেটে এসে থেমে যায়।

কিন্তু জন্মের আগ পর্যন্ত পুরুষের অণ্ডকোষ উরুর গোড়ার নালী দিয়ে অণ্ডকোষের থলিতে নেমে আসার ধারা অব্যাহত থাকে।এমনকি জনেন্দ্রীয় নীচে আসার পর কৈশোরেও গুলো পেটের বড় ধমনী থেকে স্নায়ু ও রক্ত সরবরাহ লাভ করে।আর সেগুলোর অবস্থান হল মেরুদণ্ড এবং বক্ষপাঁজরের মাঝখানে।রসবাগী নালী এবং শিরাগুলোও একই এলাকার গিয়ে মিলিত হয়।

শুক্র সামান্য পরিমাণ তরল পদার্থ

পবিত্র কোরআন মজীদ কমপক্ষে ১১ জায়গায় মানুষকে নোতফাহ (শুক্র) থেকে সৃষ্টির কথা বলেছে।‘নোতফাহ’ মানে সামান্য পরিমাণ তরল পদার্থ কিংবা পেয়ালার নীচে অবশিষ্ট সামান্য পরিমাণ তরল জিনিস।এ বিষয়ে কোরআন মজীদের নিম্নোক্ত সূরা ও আয়াতে উল্লেখ এসেছেঃ

২২:৫; ২৩:১৩;১৬:৪; ১৮:৩৭; ৩৫:১১; ৩৫:৭৭; ৪০:৬৭; ৫৩:৪৬; ৭৫:৩৭;৭৬:২; ৮০:১৯

সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞান একথা নিশ্চিত করেছে যে,গড়ে ৩ মিলিয়ন শুক্রকীট থেকে ১টি মাত্র শুক্রকীটই ডিম নিষিক্তকরণের জন্য দরকার হয়।এর অপর অর্থ হল উৎক্ষিপ্ত শুক্রকীটের ০.০০০০৩% অংশই কেবল নিষিক্ত করণের জন্য দরকার ।

সুলালাহ – তরল পদার্থের নির্যাস

মহান আল্লাহ বলেনঃ

“অতঃপর তিনি তার বংশধর সৃষ্টি করেছেন তুচ্ছ পানির নির্যাস থেকে।’সূরা আস সাজদাহ – ৮

‘সুলালাহ’শব্দটির অর্থ হল,কোন জিনিসের নির্যাস।আমরা এখন জানি যে,মানুষের দেহে তৈরি কয়েক মিলিয়ন শুক্রকীট থেকে ডিমে প্রবেশকারী একটি মাত্র শুক্রকীটই নিষিক্ত করণের জন্য দরকার।সে কয়েক মিলিয়ন থেকে ১টি মাত্র শুক্রকীটকে কোরআন ‘সুলালাহ’হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘সুলালাহ’শব্দের আরেকটি ভিন্ন অর্থ হল, তরল পদার্থ থেকে সুষম উপায়ে বের বরে আনা।তরল পদার্থ বলতে বুঝায়,শুক্রধারণকারী নারী- পুরুষের বীজ সম্পর্কিত পদার্থ।নিষিক্ত করণ প্রক্রিয়ার আওতায় ডিম ও শুক্রকে সুষম উপায়ে বের করে আনা হয়।

নোতফাতুন আমসাজ- মিশ্রিত তরল পদার্থ

মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ বলেনঃ

‘আমরা মানুষকে মিশ্রিত নোতফা থেকে সৃষ্টি করেছি।সূরা দাহার -২

এখানে ব্যবহূত ‘নোতফাতুন আমসাজ’ এর অর্থ হল,মিশ্রিত তরল পদার্থ বলতে বুঝায় পুংলিঙ্গ ও স্ত্রী লিঙ্গ জাতীয় উপাদান বা তরল পদার্থ।নারী ও পুরুষের শুক্র মিশ্রিত হওয়ার পর ভ্রূণ তখন পর্যন্ত নোতফা আকারেই বিদ্যমান থাকে।মিশ্র তরল পদার্থ বলতে শুক্রকীট জাতীয় তরল পদার্থকেও বুঝাতে পারে যা বিভিন্ন গ্রহ্নির নিঃসৃত রস থেকে এসে থাকে।

তাই ‘নোতফাতুন আমসাজ’মানে দাঁড়ায়,নারী ও পুরুষের ক্ষুদ্র পরিমাণ মিশ্র শুক্র এবং চারদিকের তরল পদার্থের অংশ বিশেষ।

লিঙ্গ নির্ধারণ

ভ্রূণের লিঙ্গ শুক্রের আকৃতি দ্বারা নির্ধারিত হয়,ডিম দ্বারা নয়।শিশু পুরুষ লিঙ্গ বা স্ত্রী লিঙ্গ যাই হোক না কেন তা নির্ভর করে xx অথবা xy জাতীয় ৩৩ জোড়া ক্রমোজমের উপর।যদি x বহনকারী শুক্র ডিমকে করে,তাহলে,ভ্রূণ হবে স্ত্রীলিঙ্গ এবং যদি তা y বহনকারী শুক্র হয়,তাহলে,ভ্রূণ হবে পুংলিঙ্গ।এ মর্মে আল্লাহ বলেনঃ

‘এবং তিনিই সুষ্টি করেন যুগল পুরুষ ও নারী।এক বিন্দু বীর্য থেকে যখন স্থলিত করা হয়।সূরা নাজম ৪৫-৪৬

এখানেও ‘নোতফা’শব্দটি ব্যবহূত হয়েছে,যার অর্থ হল,সামান্য পরিমাণ তরল পদার্থ।আর (আরবী ) মানে ,স্থলিত বা নিক্ষিপ্ত।সুতরাং বুঝা যাচ্ছে যে,‘নোতফা’ দ্বারা শুক্রকেই বুঝানো হয়েছে।কেননা,শুক্রই স্থলিত বা নিক্ষিপ্ত হয়।

আল্লাহ আরো বলেনঃ

“সে কি স্থলিত বীর্য ছিলনা ?অতঃপর সে ছিল রক্তপিণ্ড,অতঃপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল নর ও নারী।” -সূরা কেয়ামাহ – ৩৭-৩৯

এখানে পূনরায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এক ফোঁটা শুক্র যা (আরবী) পুরুষ থেকে নির্গত ও নিক্ষিপ্ত হয় সেটাই ভ্রণের লিঙ্গ নির্ধারন করে ।

পাক ভারত উপমহাদেশের শ্বাশুড়ীরা প্রায়ই নাতী ছেলে কামনা করে এবং নাতিন কন্যা হলে হলে সে জন্য বৌমাকে দোষারূপ করে।আফসুস !তারা যদি জানত যে,লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য পুরুষের শুক্রই দায়ী,নারীর ডিম নয়।যদি তারা দোষারূপ করতেই চায়,তাহলে ,তাদের ছেলেদেরকেই দোষারূপ করা উচিত,বৌ মাদেরকে নয়।কেননা কোরআন এবং বিজ্ঞান উভয়েই লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য পুরূষের শুক্রকেই দায়ী করে।

ভ্রূণ অন্ধকারের তিন পর্দার আড়ালে সুসংরক্ষিত

মহান কুদরতে অধিকারী আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন

‘তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে পর্যায়ক্রমে একের পর এক ত্রিবিধ অন্ধকারে।সূরা আয যুমার -৬

অধ্যাপক কেইথ মুরের মতে, কোরআনে উল্লেখিত অন্ধকারের তিনটি পর্দা বলতে বুঝায়ঃ

১।মাতৃগর্ভের সম্মুখ দেয়াল

২।জরায়ুর দেয়াল

৩।জরায়ুতে ভ্রূণকে আবৃতকারী গর্ভফুলের আভ্যন্তরীণ অতি পাতলা পর্দা।

ভ্রূণের পর্যায়সমূহ

আল্লাহ বলেনঃ

“আমি মানুষকে মাটির সারাংশ থেকে সৃষ্টি করেছি।অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি।এরপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তরূপে সৃষ্টি করেছি।অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত,এরপর সেই মাংসপিণ্ড থেকে হাড় সৃষ্টি করেছি,অতঃপর হাড়কে গোশত দ্বারা আবৃত করেছি।অবশেষে তাকে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করিয়েছি।নিপুণতম সুষ্টির্কতা আল্লাহ কত কল্যাণময় ? সূরা আল মোমিনূন- ১২-১৪

এ আয়াতদ্বয়ে মহান স্রষ্টা বলেন তিনি মানুষকে ক্ষুদ্র পরিমাণ তরল পদার্থ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং একে এক সুরক্ষিত বিশ্রামের স্থানে সংরক্ষিত করেছেন।এ অর্থ বুঝানোর লক্ষ্যে তিনি আরবী শব্দ (আরবী)ব্যবহার করেছেন। জরায়ু সর্বদাই পেছন দিক থেকে মেরুদণ্ড দ্বারা সংরক্ষিত। মেরুদণ্ড আবার পেছনের মাংসপেশী দ্বারা সমর্থিত।তাছাড়া ও ভ্রূণ গর্ভফুলের রস সম্পন্ন গর্ভথলি দ্বারা সংরক্ষিত।এর দ্বারা বুঝা যায় যে,ভ্রূণ একটি সুরক্ষিত স্থানে অবস্থান করে।

এই স্বল্প্ পরিমাণ তরল পর্দাথ পরে (আরবী ) বা মাংশপেশীতে পরিণত হয়।‘আলাকা’শব্দের অর্থ হল,যা আটকে থাকে।ভিন্ন কথায় বলা যায়,এটা যেন ‘জোঁক সদৃশ নির্যাস।’এই উভয় অর্থই বৈজ্ঞানিকভাবে গৃহীত।প্রাথমিক পর্যায়ে,ভ্রূণ দেয়ালে আটকে থাকে এবং দেখতে জোঁকের আকৃতি মনে হয়।আর এটা রক্তচোষা জোঁকের মত আচরণ করে।মূলত তা মায়ের গর্ভফুলের মাধ্যমে রক্ত সরবরাহ লাভ করে। (আরবী ) শব্দের ৩য় আরেকটি অর্থ হল,রক্তপিণ্ড।গর্ভ রক্তপিণ্ডের স্তরে থাকা অবস্থায় অর্থাৎ গর্ভেব ৩য় ও ৪র্থ সপ্তাহে রক্তপিণ্ডে বদ্ধ থলিতে অবস্থান করে।ফলে,ভ্রূণ রক্তপিণ্ডের আকার গ্রহণ করে এবং একই সময়ে তা জোঁকের আকৃতিও ধারণা করে।কোরআনের জ্ঞানের সাথে বিজ্ঞানের সত্য লাভের জন্য মানুষের চেষ্টাকে তুলনা করা যায়।

১৬৭৭ সালে, সর্বপ্রথম বিজ্ঞানী হাম এবং লিউওয়েন হোয়েক মাইক্রোষ্কোপ দ্বারা মানবীয় শুক্র কোষ পর্যবেক্ষণ করেন।তারা ভেবেছিলেন যে,শুত্রুকোষ যা ক্ষুদ্রকৃতির মানুষ হিসেবে বিবেচ্য তা নতুন শিশু জন্মের জন্য জরায়ুতে বিকাশ লাভ করে।এটা perforation তত্ব হিসেবে পরিচিত।কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন আবিষ্কার করলেন যে শুক্রের চাইতে ডিম বড়,তখন বিজ্ঞানী ডি গ্রাফ সহ অন্যরা ভাবলেন যে,ডিমের মধ্যে ভ্রূণ ক্ষুদ্রাকৃতিতে অবস্থান করে।পরবর্তীতে অর্থাৎ ১৮০০ শতাব্দীতে,বিজ্ঞানী মাওপেরটুইস মাতা পিতার দ্বৈত উওরাধিকার তত্ব (theory of biparental inheritence)প্রচার করেন।(আরবী) পরে (আরবী) -য় রূপান্তরিত হয়। মুদগাহ’র অর্থ হল, ১। যা দাঁত দিয়ে চিবানো হয় এবং ২। যা আঠালো ও ছোট এবং যা মুখে দেয়া হয় । যেমন গাম । এই দুটিই ব্যাখ্যাই বৈজ্ঞানিক ভাবে বিশুদ্ধ । অধ্যাপক কেইথ মুর প্লাষ্টার সীল সিল নিয়ে একে ভ্রূণের প্রাথমিক পর্যায়ের আকৃতির মত বানিয়ে দাঁত চিবান এবং একে মুগদায় পরিনত করার চেষ্টা করেন। তিনি এর মাধ্যমে এর সাথে প্রাথমিক পর্যায়ের ভ্রূণের ছবিকে তুলনা করেন। তার চিবানো ঐ প্লাষ্টার সীল somites এর মত দেখা গেল যা মেরুদণ্ডের প্রাথমিক গঠন স্তর।

এই (আরবী) পরবর্তীতে (আরবী) বা হাড়ে পরিনত হয়।বাস্তবেই হাড় কে গোশত বা মাংসপেশী পরানো হয়েছে।আল্লাহ পরে একে অন্য সৃষ্টিতে পরিনত করেন।

অধ্যাপক মশর্অল জনসন যুক্তরাষ্টের একজন খাতনামা বিজ্ঞানী Anatomy dept-এর প্রধান এবং ফিলাডেলফিয়ার থমাস জেফারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দানিয়েল ইনিষ্টিটিউটের পরিচালক।তাকে ভ্রূণতত্ব সম্পর্কে কোরআনের এই আয়াতের উপর মন্তব্য করার অনুরোধ করা হলে, তিনি প্রথমে বলেনঃ ভ্রূণের পর্যায় গুলো সম্পর্কে কোরআনের বর্ণনা গুলো শুধুমাত্র সমকালের সংঘটিত কোন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবেনা। সম্ভবত মোহাম্মদ (ছঃ) এর নিকট খুবই শক্তিশালী কোন মাইক্রোস্কোপ ছিল। যখন তকে স্মরন করিয়ে দেয়া হলো যে, কোরআন ১৪০০ বছর আগে অবতীর্ণ হয়েছে, আর মাইক্রোস্কোপ আবিস্কার হয়েছে নবী মোহাম্মদ (ছঃ) এর বহু শতাব্দী পর।তখন তিনি হেসে দেন, এবং স্বীকার করেন যে, প্রথম দিকে আবিস্কার মাইক্রোস্কোপ ১০ বারের বেশী সময়ের ক্ষুদ্র জিনিসকে বড় করে দেখতে পারেনী এবং যাও দেখিয়েছে, তাও আবার পরিস্কার ছবি দেখাতে পারেনি।তারপর তিনি বলেন ,মোহাম্মদ (ছঃ) যখন কোরআন পাঠ করেন, তখন তার উপর ঐশী বাণী নাযিল হওয়ার বিষয়ে কোন বিরোধ নেই।

ডঃ কেইথ মুর বলেন বিশ্বে গৃহীত আধুনিক কালের ভ্রূণ বিষয়ক উন্নয়ন স্তর সহজে বোধগম্য নয়।কেননা এতে স্তর গুলোকে সংখ্যাতাত্বিক ভাবে পেশ করা হয়েছে। যেমন , ১ম স্তর ইত্যাদি। কিন্তু কোরআনে বর্ণিত স্তরগুলো পার্থক্য বোধক এবং সহজে এর আকার -আকৃতি চিহ্নিত করা যায়।এইগুলো জন্মপূর্ব বিকাশের বিভিন্ন স্তরের উপর ভিত্তিশীল ও বোধগম্য এবং বাস্তব, বৈজ্ঞানিক ও মার্জিত বর্ণনার অধিকারী।

নীচের উল্লেখিত আয়াতে ও মানুষের ভ্রুণ বিকাশের স্তরগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।

আল্লাহ বলেনঃ

“সে কি স্থলিত বীর্য ছিল না? অতঃপর সে ছিল রক্তপিণ্ড, অতঃপর আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যাস্ত করেছেন।অতঃপর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন যুগল নর ও নারী।” – সূরা কিয়ামাহ – ৩৭-৩৯

আল্লাহ আরো বলেনঃ

“যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তোমাবে সুবিন্যাস্ত করেছেন এবং সুষম করেছেন। তিনি তোমাকে তাঁর ইচ্ছামত আকৃতিতে গঠন করেছেন। -সূরা আল ইনফিতার- ৭-৮

ভ্রূণ আংশিক গঠিত ও আংশিক গঠিত নয়

আরবী — এর পর্যায়ে ভ্রূণকে ছেদন করলে এবং এর আভ্যন্তরীণ অংশকে কাটলে দেখা যাবে যে, এর অধিকাংশই গঠিত হয়েছে, কিন্তু কিছু অংশ সম্পূর্ণরূপে গঠিত হয়নি।

অধ্যাপক জনসনের মতে, আমরা যদি ভ্রূণকে পূর্ণ সৃষ্টি হিসেবে বর্ণনা করি , তখর আমরা কেবল যে অংশ সৃজিত হয়েছে তারই বর্ণনা করি, তাহলে যে অংশ সৃজিত হয়নি, আমরা কেবল সে অংশেরই বর্ণনা করি। তাহলে প্রশ্ন জাগে যে, ভ্রূণ কি পূর্ণ না অপূর্ণ সৃষ্টি ?কোরআনের বর্ণনা অপেক্ষা ভ্রূণের উৎপত্তির স্তর সম্পর্কে আরো কোন উত্তম বর্ণনা নেই। কোরআনের নিম্নোক্ত আয়তে ‘আংশিক গঠিত হয়েছে’এবং ‘আংশিক গঠিত হয়নি’বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেনঃ

আমি তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, এরপর বীর্য থেকে , এর পর জমাট রক্ত থেকে , এরপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট ও অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট মাংস পিণ্ড থেকে, তোমাদের কাছে ব্যক্ত করার জন্য ।” -সূরা হজ্জ -৫

আমরা বৈজ্ঞানিক ভাবে জানি যে, বিকাশের প্রাথমিক স্তরে কিছু পার্থক্য মূলক কোষ এবং কিছু অপার্থক্য মূলক কোষ আছে। অর্থাৎ কিছু অঙ্গ তৈরী হয়েছে এবং কিছু অঙ্গ এখনও তৈরী হয়নি।

শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির অনুভূতি

বিকাশমান মানবিক ভ্রূণের মধ্যে প্রথম যে অনুভূতিটি সৃষ্টি হয় সেটি হল শ্রবন শক্তির অনুভূতি । ২৪ সপ্তাহ পর ভ্রূণ, শব্দ শুনতে পায়।তারপর দৃষ্টি শক্তি হয় এবং ২৮ সপ্তাহ পরে রেটিনা বা অক্ষিপট আলোর গতি সংবেদনশীল হয়। আল্লাহ কোরআন মজীদে বলেনঃ

“এবং তোমাদেরকে দেন কান, চোখ ও অন্তর ।” সূরা সাজদাহ -৯

আল্লাহ আরো বলেনঃ

আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে – এভাবে তাকে পরীক্ষা করবো । অতঃপর তাকে দিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি ।”- সূরা দাহর-২

আল্লাহ আরো বলেনঃ

“তিনি তোমাদের কান, চোখ অন্তঃকরন সৃষ্টি করেছেন, তোমরা খুবই অল্প কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে থাক।” -সূরা আল- মোমেনুন -৭৮

উপরোক্ত আয়াতসমূহের দৃষ্টিশক্তির আগে শ্রবণ শক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বুঝা যায় আধুনিক ভ্রূণ বিজ্ঞানের সাথে কোরআনের বর্ণনায় পরিপূণ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ।

(চলবে)

তথ্যসূত্রঃ

১) https://vedagita.wordpress.com/2015/05/30/%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A7%88%E0%A6%9C%E0%A7%8D%E0%A6%9E%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%AD%E0%A7%81%E0%A6%B2-%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%A8/

২) http://wrong-scriptures.blogspot.com/2010/09/blog-post.html

৩) http://quran.al-shia.org/bn/science/001.htm

৪) http://www.discoveringislam.org/bible_scientific_errors.htm

A Geographer. living in Chittagong. Passionate About Technology. fan of Cosmology, like Photography & love music. interested in cricket and enjoy traveling.

Tagged with: ,
Posted in পবিত্র কুরআন

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Translate
ব্লগ বিভাগ
ব্লগ সংকলন
Follow Aimnote.TK on WordPress.com
%d bloggers like this: