কে এই নিজামি? চেনেন কেউ?

নিজামী

।।১।।

১৯৬৬-৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিল পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার লুৎফর রহমান খানের ছেলে মতিউর। নিজামী তার বংশের উপাধী ছিল না। লুৎফর ছেলের নাম রেখেছিলেন মতিউর রহমান। কিন্তু ছেলে যে জামাতে ইসলামে যোগ দিয়েছে। নামটা একটু ভারী করতে হবেনা? নাহলে তো নেতা নেতা ভাভ আসবেনা। তাই মতিউর তার নামের সাথে নিজামী যোগ করে নামটাকে করলে মতিউর রহমান নিজামী। হ্যাঁ, এইবার একটু ভারী ভারী মনে হচ্ছে। হলোও তাই, পরপর দুইবার মতি পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি হলো।

২০১০ সালের ১৭ই মার্চ একটি জনসভায় ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমির রফিকুল ইসলাম নিপীড়নের কথা উল্লেখ করে নিজামীর জীবনকে নবী মুহাম্মদ(সঃ) -এর সাথে তুলনা করেন। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতিতে আঘাত করেছে, এমন অভিযোগে ২১শে মার্চ বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ঢাকা মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম খাঁন ও ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) ছাত্রশিবিরের সভাপতি আ স ম ইয়াহিয়ার নামে মামলা করেন।
২৯ জুন, ২০১০ তারিখে রমনা থানা পুলিশ প্রেসক্লাবের সামনে থেকে মতিউর রহমান নিজামীসহ আরো তিনজন সিনিয়র জামায়াত নেতাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি পরের দিন জামিনের জন্য আবেদন করেন এবং ১৪ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালে মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য আবেদন করেন। ২০১১ সালের মার্চে উচ্চ আদালত মামলাটি চার মাসের জন্য মুলতুবি ঘোষণা করেন

যারা আমার পোস্টে নিজামীকে ফাঁসি দেয়া মানে ইসলামকে বাধা দেওয়া এইসব গাঁজাখুরি বকতে আসবেন তাদের জন্য আগেই উপরের অংশটা দিয়ে দিলাম।

।।২।।

দুঃখের ব্যাপার, ২০১০ সালের ২৯ জুন অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার নিজামীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেফতার দেখানো হয়। দুঃখের ব্যাপার কেন বলছি, কারণ মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ী থাকা সত্ত্বেও সে কিভাবে অন্য অপরাধ করার সুযোগ পায়!!

২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর জামায়াতের আমিরের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ উপস্থাপন করে ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষ। ২৮ ডিসেম্বর আদালত অভিযোগ আমলে নেয়। ২০১২ সালের ২৮ মে থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে হত্যা, লুট, ধর্ষণ, উস্কানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার মতো ১৬টি অভিযোগ আছে নিজামীর বিরুদ্ধে।

আলবহর বাহিনীর প্রধাণ এই মতিউর গ্রামের লোকেদের কাছে এতটাই ঘৃণার পাত্র ছিলেন যে ,তার অঞ্চলের মানুষ তাকে এখনও মইত্যা দালাল,মইত্যা রাজাকার বলে ডাকে।

এই মইত্যা দালালের পরিচালনায় সংগঠিত আলবদর বাহিনীর প্রধাণ কাজ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবিদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরী করা ও তাদের নিশ্চিহ্ন করা। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সমর্থকদের হত্যা করা, বাংলাদেশে তথাকথিত ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা এগুলোও ছিল । এরকম অনেক ঘটনা তখন লোকমুখে প্রচলিত ছিল।

রাষ্ট্রপক্ষ মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের যেসব অভিযোগ আনেন সেগুলো হলো

১। পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিনকে ১৯৭১ সালের ৪ জুন পাকিস্তানি সেনারা অপহরণ করে নূরপুর পাওয়ার হাউসের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে নিজামীর উপস্থিতিতে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ১০ জুন তাকে ইছামতী নদীর পাড়ে আরো কয়েকজনের সঙ্গে হত্যা করা হয়।

২। ১৯৭১ সালের ১০ মে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়ি গ্রামের রূপসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের একটি সভায় নিজামী উপস্থিত ছিলেন। সভায় পরিকল্পনা করে ১৪ মে পাকিস্তানি সেনারা দুইটি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪৫০ জনকে হত্যা করে এবং রাজাকাররা প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ করে।

৩। ১৯৭১ সালের মে মাসের শুরু থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণের ঘটনায় নিজামীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কারণ তিনি ঐ ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।

৪। করমজা গ্রামে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ।

৫। ১৯৭১ সালের ১৬ এপ্রিল নিজামীর সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা ঈশ্বরদী উপজেলার আড়পাড়া ও ভূতের বাড়ি গ্রামে হামলা চালিয়ে বাড়িঘর লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় ২১ জন নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করা হয়।

৬। নিজামী ১৯৭১ সালের ২৭ নভেম্বর ধুলাউড়া গ্রামে ৩০ জনকে হত্যায় নেতৃত্ব দেন ও তার সম্পৃক্ততা ছিল।

৭। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর সোহরাব আলী নামক এক ব্যক্তিকে নির্যাতন ও হত্যা করেন।

৮। ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট নিজামী নাখালপাড়ার পুরোনো এমপি হোস্টেলে গিয়ে আটক রুমী, বদি, জালালদের হত্যার ঘটনায় পাকিস্তানি সেনাদের প্ররোচনা দেন।

৯। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর হিন্দু অধ্যুষিত বিশালিখা গ্রামে ৭০ জনকে গণহত্যা করেন।

১০। নিজামীর নির্দেশে রাজাকাররা পাবনার সোনাতলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র কুণ্ডুর বাড়িতে আগুন দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

১১। ১৯৭১ সালের ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটে ইসলামী ছাত্রসংঘ আয়োজিত সভায় নিজামী উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন।

১২। ২২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক একাডেমি হলে আল মাদানীর স্মরণসভায় উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য ১২ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়।

১৩। ৮ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে ছাত্রসংঘের সভায় বক্তব্যের জন্য ১৩ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়।

১৪। ১০ সেপ্টেম্বর যশোরে রাজাকারদের প্রধান কার্যালয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্য ১৪ নম্বর অভিযোগ গঠন করা হয়।

১৫। ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থিত রাজাকার ক্যাম্পে নিজামী ও রাজাকার সামাদ মিয়ার ষড়যন্ত্রে সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়।

১৬। ১৯৭১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর জামায়াতের তত্কালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ ও আলবদর বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেন এবং আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিজামীর বিরোদ্ধে এই অভিযোগ আনা হয়।

।।৩।।
নাম ভারী হয়েছে, এবার পেয়ারে পাকিস্তানের জন্য তো কিছু করতে হয়। আলবদর বাহিনীর দ্বারা তো কাজ হচ্ছেই, সেই সাথে লেখালেখিটাও চালিয়ে গেছে মইত্যা।

দৈনিক সংগ্রাম, এপ্রিল ১৩, ১৯৭১

“১৯৭১ সালের ১২ই এপ্রিল পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনের জন্য গোলাম আযম এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সহযোগী, যেমন সবুর খানের সাথে মতিউর ঢাকায় একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেয়। শান্তি কমিটির ব্যানারে এই মিছিল পাকিস্তানের বিজয়ের জন্য বিশেষ প্রার্থনার মাধ্যমে শেষ হয়।”

দৈনিক সংগ্রাম, ১৯ জুলাই ১৯৭১

“হিন্দুরা মুসলমানের বন্ধু এমন কোন প্রমাণ নেই।”

দৈনিক সংগ্রাম, ৩ আগস্ট ১৯৭১

“পাকিস্তান টিকে থাকবেই”

দৈনিক সংগ্রাম, সেপ্টেম্বর ১৫, ১৯৭১

“জাতীয় সংকটের এই মুহুর্তে যারা পাকিস্তান এবং ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত, তাদের সকলকে নিশ্চিহ্ন করার জাতীয় দায়িত্ব পালন করা প্রত্যেক রাজাকারের কর্তব্য।”

দৈনিক সংগ্রাম, নভেম্বর ১৪, ১৯৭১

“সেইদিন বেশী দূরে নয় আল-বদরের তরুনরা সশ্রস্ত বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে হিন্দু শক্তিকে পরাজিত করবে এবং ভারত ধ্বংসের পর ইসলামের বিজয় পতাকা সারাবিশ্বে উত্তোলন করবে।”

এরকম আরো কিছু পেপার কাটিং সংযুক্ত করে দিলাম।

।।৪।।
অনেকে প্রশ্ন করেন, এত বছর আগের কথা এখন টেনে আনার কি দরকার? আগে দুইদিন আগে শাপলা চত্বরে যেই মানুষ মারা হয়েছে সেগুলোর বিচার করেন, রাজন হত্যার বিচার করেন, রানা প্লাজা, তাজরিন গার্মেন্টস এ নিহতদের হত্যার বিচার করেন। আমি বলতে চাই, হ্যাঁ বিচার হবে, সবগুলোরই বিচার হবে। কিন্তু আমাদের ত্রিশ লক্ষ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে যেই দেশ, সেই দেশ যারা চায়নি, দেশের মানুষকে যারা পিঁপড়ার মত মেরেছে, আমাদের নারীদের অপমান করেছে, তাদের বিচার হোক তারপর সবার বিচার করব। সেই রাজাকারদের যারা দেশে নিয়ে এসেছে তাদের বিচার করব, তাদের গাড়িতে পতাকা লাগিয়েছে তাদের বিচার করব, এদেশের মানুষকে যারা নির্বিচারে বাসের মধ্যে পুড়িয়েছে তাদের বিচার করব। পাহাড়ি যেই মেয়েটিকে তুলে নিয়ে গেছে তাদের বিচার করব।

একাত্তরে যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের দোষ কি ছিল? তারা বাংলা ভাষায় কথা বলতে চেয়েছে তাই বলে? তারা নিজের সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে থাকতে চেয়েছিল তাই বলে?

সদ্য জন্ম নেয়া সেই শিশুটির দোষ কি ছিল?

কুরআন পড়তে বসা সেই মহিলাটার দোষ ছিল?

নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে ইন্ডিয়ায় চলে না যাওয়া সেই পরিবারটির দোষ ছিল?

হ্যাঁ, আমি রাজাকারের ফাঁসিতে উল্লসিত হই। নেই আমার মানবতা। হাজার হাজার মানুষের হত্যাকারী এইসব প্রাণীদের ফাঁসির সময় যেই মানবতা জেগে উঠে সেই মানবতা আমার নেই।

>>>>ফাহিম রিজওয়ান অংকুর

Advertisements

student.living in Chittagong, Bangladesh. fan of technology, photography, and music.interested in cricket and travel.

Tagged with: ,
Posted in অনির্বাচিত, অপরাধ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

ব্লগ বিভাগ
ব্লগ সংকলন
%d bloggers like this: