বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও জ্বালানি নিরাপত্তা

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বিরাজমান আজকের সংকট কারিগরী কারণে নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতা আর দুর্নীতির প্রচন্ড ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত। একই সাথে জ্বালানি তথা কয়লা ও গ্যাস খাতও সীমাহীন সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষন করলে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, জ্বালানী নিরাপত্তা বলতে যা বুঝায় তা আজ স্পষ্টভাবে অনুপস্থিত। যে জ্বালানি সরবরাহের কোনো নিশ্চয়তা নেই, জ্বালানীর গুণ মানসম্মত নয়, জ্বালানী খাত আর্থিক ও কারিগরীভাবে স্বয়ম্ভর হয়ে উঠতে পারছে না- সে ধরনের জ্বালানী খাতকেই বলা হয় নিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত এক বিধ্বস্ত খাত। বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উপাত্ত যেহেতু জ্বালানি, সুতরাং নিরাপত্তাবিহীন এক বিধ্বস্ত জ্বালানী সরবরাহের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটবে বিদ্যুৎ খাতেও। তাই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতও আজ নিরাপত্তাহীন, বিধ্বস্ত এবং আকণ্ঠ সংকটে নিমজ্জিত। কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিল না।

সংকটের রাজনৈতিক পটভূমি
বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাতে গত প্রায় ১৫ বছরের ইতিহাস ঘাটলে এবং প্রতিটি প্রকল্প ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বিশ্লেষন করলে দেখা যাবে যে, তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বভূক্ত দেশগুলোর যেসব দেশে সরকার প্রকৃত অর্থে স্বাধীনভাবে জনগনের কল্যানে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করতে পারে না বা চায় না, সেসব দেশে বিদুৎ, জ্বালানী, কৃষি, টেলিযোগাযোগ, নদী, বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভৌত অবকাঠামোগুলিতে সাম্রাজ্যবাদীরা প্রধানতঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রভাবিত দেশগুলো, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ ইত্যাদির মাধ্যমে জনস্বার্থবিরোধী প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
বিশ্বব্যাংক ও এডিবি কেন এ ধরনের কাজ করে? এসব প্রতিষ্ঠান গঠনের যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ ১৯৪৫ ইং সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশ হারিয়ে ফেললো তখন ১৯৫০ ইং সালে বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থাপন করে তাদের মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্বভুক্ত অনেক দেশে এক ধরনের আর্থিক ও অর্থনৈতিক ঔপনিবেশ স্থাপন করল। এর ফলে ধনী দেশগুলো তথাকথিত উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে প্রয়োজনীয় সম্পদ যেমন- তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ পাচার করে নিয়ে যাচ্ছে- তেমনি তাদের উৎপাদিত মালামাল, পরামর্শক এসব দেশে বিক্রি করার অবাধ বাজার সৃষ্টি করে রেখেছে। আর এসব হচ্ছে কখনো বিশ্বব্যাংক ও এডিবির প্রদত্ত ঋণে, কখনো বা এসব ধনী দেশসমূহের সরাসরি অর্থ বিনিয়োগে। কাজেই আমরা দেখি, খুবই সঙ্গত কারনে আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহ বিশেষত জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে প্রায় সকল প্রকল্পই অধিকাংশ সময়ে আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। ধনী দেশসমূহের বাণিজ্যের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে হয় বলেই এসব খাতে সংকট লেগেই থাকে। সার্বিকভাবে এ খাতের আলোচনা অনেক দীর্ঘ হলেও আজ এ আলোচনা আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এজন্য যে, দেশপ্রেমিক জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এখনই এ সমস্ত অপকর্মকে বাধা না দেয় তাহলে দেশ ও জাতির ১৭৫৭ সালে পলাশী প্রান্তরে হারানো স্বাধীনতাকে উদ্ধার করতে যদি ১৯০ বছর লেগে থাকে, আজকের হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতাকে উদ্ধার করতে সহস্র বছর লাগবে। কারণ আজকের উপনিবেশ পরোক্ষ, প্রত্যক্ষ নয় বিধায় দুখঃজনকভাবে তার পক্ষে অনেক ভাড়া করা বুদ্ধিজীবি, অনেক ‘তথাকথিত’ প্রগতিশীল, অনেক ‘বামপন্থী’ও রয়েছে। আবার এ ধরনের অপ্রত্যক্ষ উপনিবেশে অধিষ্ঠিত সরকারগুলো অনেক ‘প্রগতিশীল’ ও ‘জাতীয় স্বার্থের’ কথাবার্তা বলে জনগণকে নিয়তই বিভ্রান্ত করে থাকে। সোজা সাপটা কথায় এসব খাতের সংকট ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণকে আলাদা করে ভাববার কোন ফুরসৎ নেই। বিষয়গুলো বুঝতে হলে এক মন দিয়ে একাগ্র চিত্তে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট গুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। সংকটের কারণগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে, সমাধানের পথ নির্দেশ করতে হবে এবং বাংলাদেশকে জ্বালানী ও বিদ্যুৎ খাতে একটি স্বয়ম্ভর দেশ গড়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন আমরা জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সংকট ও আজকের কথিত বিদ্যুৎ সংকটের সম্ভাব্য সমাধানের দিকে নজর দেই।

বিদ্যুৎ সংকট ও সমাধান
এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বললেন অত্যন্ত স্বল্প ব্যয়ে ও অল্প সময়ে এ সংকট সমাধানযোগ্য। কিন্তু অতীতে সরকারের ন্যয় এ সরকারও এ ধরনের তথাকথিত জটিল কারিগরী ও অর্থনির্ভর প্রকল্প নিংড়ে অর্থ কামাবার লোভ সম্বরন না করার ফলে ওপথে যায় নি। একই সিন্ডিকেটের অধীনে এরাও অবৈধ রেন্টাল/মার্চেন্ট প্লান্টসহ বিদেশনির্ভর সব ধরণের গর্হিত প্রকল্প নির্মানে গেল এবং সমস্যাকে জিইয়ে রাখলো। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সৃষ্টি অব্দি সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে অপরাধমূলক, সবচেয়ে কলংকজনক, সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত, সবচেয়ে বেপরোয়া, সবচেয়ে অনৈতিক, সবচেয়ে অস্বচ্ছ এবং সবচেয়ে জনবিরোধী সিদ্ধান্ত নিল অযাচিত(unsolicited) রেন্টাল বিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে। এরা এটার নাম দিয়েছে ‘কুইক রেন্টাল’।
এ কথা নির্র্দ্ধিধায় বলা যায় যে, বিদ্যুৎ খাতে এ ধরনের ব্যত্যয়গুলো ইচ্ছে করে ঘটানো হচ্ছে। কারণ নীতির বাইরে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এ ধরনের জটিল কারিগরী খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ খাতে সংকট জিইয়ে রেখে দীর্ঘ কয়েক বছর এখাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে আজ বিদ্যুৎ খাতের অবস্থা বুঝতে নীচের প্রতিবেদনটির দিকে নজর দিতে অনুরোধ করছি।

…………………………………………………………………..২০০৯ …………………২০১২
১।উৎপাদন ক্ষমতা (নামফলক অনুযায়ী)………………… – ৫৮০৩ মেগাওয়াট…….৮৪০৩ মেগাওয়াট
২।নিশ্চয়তা ছাড়া কদাচিৎ চালু করা যায় এমন ক্ষমতা(সর্ব্বোচ্চ) ৪২৪০ মেঃওঃ ….. ৫০০০ মেঃওঃ
৩।নির্ভরশীল উৎপাদন ক্ষমতা যার নিশ্চয়তা আছে……………… ৩৫০০মেঃ ………. ৪৮০০মেঃওঃ
৪।সবোর্চ্চ চাহিদা …………………………………………….. – ৬০০০ মেঃওঃ ………. ৭৫০০মেঃওঃ
৫।ঘাটতি (৬০০০/৭০০০-২৫০০/৩৫০০) অর্থাৎ প্রায় ৪২% ঘাটতি – ২৫০০ মেঃওঃ … ২৫০০মেঃওঃ
৬।সরকারি হিসেব অনুযায়ী উৎপাদন থেকে গ্রাহক পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় ও বিল রেট ৫.৫০ টাকা/ইউনিট
৭।বিশেষজ্ঞ হিসেব অনুযায়ী গড় উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট -১.৫০+০.৯০ ধরে এ ব্যয় সর্বোচ্চ হওয়া উচিৎ ২.৫০ টাকা/ইউনিট (বিতরণ, সঞ্চালন ও বিক্রয় ব্যয় বাবদ)
(ডিসেম্বর ২০১২ ইং পর্য্যন্ত)

এ সমস্যা সমাধানে আমরা সুষ্পষ্টভাবে নীচের পদক্ষেপসমূহ নিতে পারি
(১)দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সাশ্রয় বৃদ্ধি ও পুরোনো পাওয়ার ষ্টেশনের দক্ষতা বৃদ্ধি করে ৬ মাস থেকে এক বছরের মধ্যে ২৫০০ মেঃওঃ ক্ষমতা বৃদ্ধি।
(২)নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবহার করে২০০০ মেঃওঃ, যা সুবৃস্তৃতভাবে নীচের সারনীতে দেয়া হলো-


সারণি-১


সারণি-২


সারণি-৩

এ প্রসঙ্গে জ্বালানী বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচুর গ্যাস আছে। সরকারের মধ্যকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী একটা অংশের অপতৎপরতার ফলে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা যাচ্ছে না। তাই গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না প্রত্যাশামত। দেশবিরোধী এই চক্রটি এখন গ্যাসের কৃত্রিম সঙ্কট সৃস্টি করছে। যে কোনো মূল্যে তারা গ্যাস বিদেশে পাচার করার জন্য মুখিয়ে আছে। তারা বলছে উৎপাদন বাড়াতে গেলে চাপ কমে গিয়ে গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অথচ শেভরন তো বিবিয়ানায় অধিক হারে উৎপাদন চালাচ্ছে, কই সেখানে তো গ্যাসের চাপ কমছে না।’ তাঁরা আরো বলেন, ‘প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়ে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হলে, চলমান কূপগুলো ওয়ার্কওভার এবং উন্নয়নের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বর্তমান সঙ্কট মিটিয়ে গ্যাস উদ্বৃত্ত করা সম্ভব।’ জরুরী ভিত্তিতে বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করে ভূমিতে গ্যাস উত্তোলনের দ্বায়িত্ব প্রদান সহ সাগরবক্ষে বাপেক্স-এর আওতায় প্রয়োজনে বিদেশী অভিজ্ঞ প্রকৈাশলী এনে গ্যাস উত্তোলনের দ্বায়িত্ব প্রদান করতে হবে।
সুতরা এটা প্রতিফলিত যে, এগুলি একই সূত্রে গাঁথা। উদ্দেশ্য একটিই- বিদ্যুৎ ও জ্বালানী খাত বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া ও গনবিরোধী প্রকল্প গ্রহণ করে অনৈতিক পথে অর্থ উপার্জন।

কয়লা সংকট ও সমাধান
দেশে প্রাপ্তব্য গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে বিলম্ব ঘটানো হচ্ছে। আপাতত: জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাসিফিকেশানের মাধ্যমে কয়লা ব্যবহার করে ‘কয়লা নির্ভর’ এলাকা ভিত্তিক ছড়ানো উৎপাদনের (Area Based Distributed Generation) মাধ্যমে আগামী ২০ মাস থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে প্রায় ৩০০০ মেঃওঃ (যা পর্যায়ক্রমে পরবর্তী ১২ মাসের মধ্যে ৬০০০ মেঃ ওয়াটে উত্তীর্নযোগ্য সে সুযোগ রেখে) বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করা। তবে এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কয়লা আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যাসিফিকেশানের মাধ্যমে উত্তোলন করে ব্যবহার করার কথা সামনে রেখে পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে হবে।
অবিলম্বে কয়লা নীতি অনুমোদনসহ বাংলাদেশে কয়লা উত্তোলনের সঠিক পন্থা যে ওপেন পিট মাইনিং কিংবা আন্ডার গ্রাউন্ড মাইনিং নয় এবং কয়লা গ্যাসিফিকেশন পদ্ধতি সরকারকে সে বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

জনগণের কল্যাণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী প্রকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
টেকসই জ্বালানী(Sustainable Energy) ব্যবহারের স্বার্থে এবং জ্বালানী নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রতিটি জ্বালানী ব্যবহার করে সম্ভাব্য কি পরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব, তাতে কত ব্যয় এবং সম্ভাব্য নির্মাণ সময়, জ্বালানীর মজুদ ও উক্ত জ্বালানী দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রাপ্তির ব্যপ্তিকালের একটি ছক সবাইর অবগতির জন্য নীচে দেয়া হলো। তাতে প্রনিধানযোগ্য একটিই শর্ত আর তা হলো যে সরকারকে অবশ্যই ‘জনগণের সরকার’ হতে হবে। এ সংকটের কারণ যে রাজনৈতিক, কারিগরী কারণে নয় এ কথা এখন খুবই স্পষ্ট। এবং এটি আরো স্পষ্ট যে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থ রক্ষায় এধরনের সরকারগুলো জণগণের স্বার্থ শুধুমাত্র কমিশনের লোভে কত সহজে বিলিয়ে দেয়!! নীচে সম্ভাব্য ও প্রাপ্তব্য জ্বালানী উৎস থেকে কত অর্থ ব্যয়ে কি পরিমান বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব পাঠকদের অবগতির জন্য তার একটি প্রাক্কলন দেয়া হলো।

ভারত-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ চুক্তি

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের বর্তমান কয়লা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সম্পর্কে ছোট একটি বর্ণনা দিলেই ভারতের ২৫০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ, উৎপাদন কেন্দ্র সংরক্ষণ চুক্তির নেপথ্যের ধরনটা সহজেই ধরা পড়বে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন থেকে এক অনিরাময়যোগ্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যেই চলছে। দেশের সামাজিক, আর্থিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন দৃঢ়, টেকসই ও নির্ভরশীল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। আর নির্ভরশীল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হতে পারে নিষ্ঠাবান, সৎ, স্বচ্ছ ও দেশপ্রেমিক প্রজ্ঞাবান লোকদের পরিশ্রমে ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা একটি জটিল কারিগরি ব্যবস্থা হলেও তার প্রয়োজনীয় সম্প্রসারণ, স্থায়ীত্ব ও যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচালন করে এ ব্যবস্থাকে কি পরিমাণ মানসম্পন্ন করে তুলবে তা নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর। আমাদের মতো উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। তথ্য ও যুক্তি দিয়ে এ কথা প্রমাণ করা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মধ্যে নিমজ্জিত বলে কাঙ্ক্ষিত জাতীয় উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে না।
তথ্য ও তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে এবং গেল কয়েক যুগের তথ্যসমূহ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের হার সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নের অর্থাৎ মোট জাতীয় উৎপাদনের দ্বিগুণ হারে বাস্তবায়ন করতে হয় এবং এজন্য যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হবে তা হতে হবে,
(ক)নির্ভরশীল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা অর্থাৎ যা হবে নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহযোগ্য।
(খ)মানসম্মত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থা।
(গ)সাশ্রয়ী ও যৌক্তিক মূল্যে ট্যারিফ নির্ধারণ অর্থাৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উৎপাদন থেকে শুরু করে গ্রাহক পর্যন্ত সরবরাহ করতে সার্বিক ব্যয় হতে হবে যৌক্তিক পর্যায়ে।

কিন্তু বর্তমানে এর কোনোটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তার কারণসমূহ হলো :
(ক) ঔপনিবেশিক আমলে গড়া অদক্ষ আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা, (খ) এ খাতে স্বচ্ছ, সৎ, নিষ্ঠাবান ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদের পদায়ন না করা, (গ) এ খাতের জন্য জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো সম্পূর্ণ জ্বালানি নীতি না থাকা, (ঘ) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সাশ্রয়ী ও সংরক্ষণনীতি না থাকা, (ঙ) ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্নীতির স্বার্থে সঠিক সময়ে সঠিক নীতে মেনে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনীহা, (চ) এখাতে সাশ্রয়ী (দক্ষ) যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও সংরক্ষণ (কনজারভেশন) নীতি বাস্তবায়ন না করা ও (ছ) বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ এ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রাথমিক জ্বালানি যথা গ্যাস, কয়লা, পানি, সূর্যতাপ প্রাপ্য এ সম্পদগুলোর সঠিক ব্যবহার করে সহজ ও সাশ্রয়ী মূল্যে জনগণের কাছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়া।

এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ ধরনের ব্যত্যয়গুলো ইচ্ছে করে ঘটানো হচ্ছে। কারণ নীতির বাইরে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে এ ধরনের জটিল কারিগরি খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। এর ফলে আমরা দেখতে পাচ্ছি ইচ্ছাকৃতভাবে এ খাতে সংকট জিইয়ে রেখে দীর্ঘ কয়েক বছরে এখাত থেকে হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। এজন্য আজ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শুধু দুরবস্থাই নয়, অযাচিতভাবে ভোক্তাজনগণকে অধিক মূল্য দিয়ে নিম্নমাণের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে।
যথাযথ মান ও নির্ভরশীল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বাস্তবায়নে সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং আজ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাথমিক জ্বালানি তথা কয়লা, গ্যাস, পানি, সোলার ব্যবহারে সঠিক পন্থা নির্ধারণে সিদ্ধান্ত হীনতার কারণে খুব শিগগিরই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিরাপত্তা তথা জাতীয় নিরাপত্তা এক হুমকির মুখে পড়বে। অথচ সরকারকে এ বিষয়ে দেশের অভিজ্ঞমহল বারবার যথাযথ হুঁশিয়ারি দিয়ে আসলেও বিশ্বব্যাঙ্ক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অযাচিত পরামর্শসহ চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের প্রভাবের ফলে আজ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংকটমুক্ত তো হয়ইনি, বরং দিন দিন এ খাতের সংকট আরো বাড়বে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে লাগসই নীতি প্রণয়নসহ তা বাস্তবায়নে দেশের বিভিন্ন অভিজ্ঞদের হিসেব ও পরামর্শ সেমিনার কিংবা কর্মশালায় সর্বজনীন মতামতের মাধ্যমে গৃহীত উপায়সমূহ বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় কিংবা গত ১৫/২০ বছর ক্ষমতায় আসীন বিভিন্ন সরকারসমূহের বিশেষ উপদেষ্টা/উপদেষ্টা/প্রতিমন্ত্রী/মন্ত্রীদের কাছে দাখিলও করা হয়।
দেশপ্রমিক ও নিষ্ঠাবান অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের হিসাব ও পরামর্শ অনুযায়ী যেভাবে খুব অল্প সময় ও ব্যয়ে হিসাবকৃত ২৫০০ মেগাওয়াট ঘাটতি পূরণ, দৈনিক ২৩০ কোটি ঘনফুটের চাহিদার অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করেও আরো কিছু বাড়তি গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী নিচে দেওয়া হলো :
পুরনো অদক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে নবায়ন করে ৬০০ মেগাওয়াট (যা বর্তমানে ভারতকে বিনা বাধায় দিয়ে দেওয়া হচ্ছে), কো-জেনারেশনের মাধ্যমে ২০০ মেগাওয়াট, নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে ৫০০ মেগাওয়াট অর্থাৎ ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায় ১৫০০ মেগাওয়াট ও লোড ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আরো ৪০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় অর্থাৎ প্রায় ৩০০০ মেগাওয়াট হয় সাশ্রয় বা উৎপাদন বৃদ্ধি করে আগামী ১২ মাসের মধ্যে সিস্টেম নির্ভরশীলতা নিশ্চিতভাবে বাড়ানো যায়। নিষ্ঠা, শ্রম ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিশ্রম করলে ন্যূনতম ২০০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় (উৎপাদন বৃদ্ধিসহ) করা তো অবশ্যই সম্ভব।
সম্প্রতি আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো গ্যাসের অপ্রতুলতার কারণে ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছে শিল্প, বাণিজ্য ও আবাসিক গ্রাহকরা। গ্যাসের অভাবে শিল্প উৎপাদনে ধস নেমেছে। বাড়িঘরে চুলা জ্বলছে না অধিকাংশ সময়। জনগণকে বোকা বানানোর জন্য দ্রুত গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্প, মধ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ফাস্ট ট্রাক প্রকল্প গ্রহণের কল্পকাহিনী বলা হয়েছিল। অথচ ইতোমধ্যেই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার সময়সূচির ৬ মাস পেরিয়ে গেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৯০ থেকে ১৯৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু চাহিদা আছে প্রায় ২৩০ কোটি ঘনফুটের। ঘাটতি আছে প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুটের। প্রতি বছর প্রায় ৮ শতাংশ হারে গ্যাসের চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় গেল ২০০৯ সালে ৪টি কূপের ওয়ার্কওভার এবং ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের ২টি উন্নয়ন কূপ খনন করে দৈনিক ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে নতুন দুটি কূপ চালুর মাধ্যমে ২ কোটি, তিতাসের ১৪ নম্বর কূপ থেকে আড়াই কোটি, মেঘনা-১ থেকে দেড় কোটি ও নাইকো পরিচালিত ফেনী ক্ষেত্র থেকে চার কোটি ঘনফুট অর্থাৎ সর্বমোট ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তিতাস থেকে মাত্র দেড় কোটি ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও সরকারের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা সিন্ডিকেট সদস্যরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দিতে সফল হয়েছে।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ৫টি উন্নয়ন কূপ, ৪টি ওয়ার্কওভার কূপ এবং ৪টি অনুসন্ধান কূপ খনন করে ২০১১ সালের নভেম্বর মাসের মধ্যে অন্তত ১২টি নতুন কূপ থেকে দৈনিক ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে ৪টি কূপ খনন; হরিপুর, কৈলাসটিলা ও রশীদপুর গ্যাসক্ষেত্রের ৫টি কূপ খনন এবং ৭ নম্বর ব্লকের অনুসন্ধান কূপ খনন করে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৩১৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখনকার চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছিল ২৯৭ কোটি ঘনফুটের মতো। ফলে তখন ১৮-১৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস উদ্বৃত্ত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছিল। পাশাপাশি বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০০৮-এর আওতায় ২০১৬-এর ডিসেম্বর মাস নাগাদ দৈনিক ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে লিজের প্রক্রিয়াধীন সমুদ্রবক্ষের ক্ষেত্রগুলোসহ অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে ১শ’ কোটি ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়াও দ্রুত গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে ফাস্ট ট্রাক নামে একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণের কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে যা এ বছরের জুন থেকে ২০১২ সালের মে মাস পর্যন্ত চলবে বলে বলা হয়েছিল। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান এবং গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর কাজ একইসঙ্গে চলবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দৈনিক প্রায় ৪৪ কোটি ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদন করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে চলমান ঘাটতি পূরণ করে বাড়তি চাহিদাও মেটানো যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পথ বাতলাচ্ছেন। একদল বলছেন, গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধিতে কূপ খননের বিকল্প নেই। এখনই উচিত নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া। আরেকদল বলছেন, নতুনের আগে সরকারের উচিত স্থগিত কূপসমূহ পুনরায় চালুর পদক্ষেপ নেয়া এবং চলমান কূপগুলোতে উৎপাদনের হার বৃদ্ধির চেষ্টা চালানো। উৎপাদন কম হওয়াটা আমাদের কারিগরি নাকি প্রাকৃতিক সমস্যা তা শিগগিরই পরীক্ষা করে দেখা উচিত। যদি প্রাকৃতিক কোনো সমস্যা না হয় তাহলে প্রয়োজনীয় কারিগরি সমস্যা দূর করে চলমান কূপগুলোতেই উৎপাদন বাড়াবার জন্য আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘আমাদের দেশে প্রচুর গ্যাস আছে। সরকারের মধ্যকার জাতীয় স্বার্থবিরোধী একটা অংশের অপতৎপরতার ফলে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা যাচ্ছে না। তাই গ্যাসও পাওয়া যাচ্ছে না প্রত্যাশামত। দেশবিরোধী এই চক্রটি এখন গ্যাসের কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করছে। যে কোনো মূল্যে তারা গ্যাস বিদেশে পাচার করার জন্য মুখিয়ে আছে। তারা বলছে উৎপাদন বাড়াতে গেলে চাপ কমে গিয়ে গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অথচ শেভরন তো বিবিয়ানায় অধিক হারে উৎপাদন চালাচ্ছে, কই সেখানে তো গ্যাসের চাপ কমছে না।’ তারা আরো বলেন, ‘প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়ে বাপেক্সকে শক্তিশালী করা হলে, চলমান কূপগুলো ওয়ার্কওভার এবং উন্নয়নের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বর্তমান সঙ্কট মিটিয়ে গ্যাস উদ্বৃত্ত করা সম্ভব।’
ওয়ার্কওভার এবং নতুন কূপ খননের যেসব প্রকল্প সরকার শুরু করতে যাচ্ছে সেখানে বাপেক্সের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে বাপেক্সের হাতে যতো কাজ আছে তাতে করে তার পক্ষে নতুন কোনো কাজের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কাজগুলো পেতে যাচ্ছে কতগুলো বিদেশী কোম্পানি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারকে এ ধরনের পরিকল্পনা বাতিল করে দ্রুত বাপেক্সকে শক্তিশালীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে গ্যাসের সমস্যাও মিটবে, সরকারও লাভবান হবে।
এখন বলা হচ্ছে আমাদের দেশে গ্যাস নেই। যারা এখন তা বলছেন তারাই একসময় বাংলাদেশ গ্যাসের সাগরে ভাসছে বলে চিৎকার করে গ্যাস রফতানির জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। আজ তারাই আবার বাংলাদেশকে অফুরান পিট কয়লা ও মূল্যবান কয়লার ভান্ডার বলে অভিহিত করে কয়লাকেও বিদেশে রফতানির জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। তাদের বক্তব্য হলো এর জন্য প্রয়োজন হলে মাটি খুঁড়ে জমি নষ্ট করে হলেও সব কয়লা উত্তোলন করে বেঁচে দাও। এ থেকে প্রাপ্ত অর্থে দেশে অবিলম্বে শিল্পায়ন করার পদক্ষেপ নাও। আমাদের দেশ ধনী হবে পরে বেশি দামে গ্যাস, কয়লা আবার আমদানি করা যাবে। এরা বিদেশের দালাল। তারা এদেশকে অপরের হাতে জিম্মি করতে চায় বলেই গ্যাস ও কয়লা খাতের মতো বিদ্যুৎ খাতের সমস্যাও সমাধান করে না। একে জিইয়ে রেখে আমাদের বাধ্য করছে যেন আমরা তাদের কথা শুনি। এরা এভাবে সমস্যার সমাধান না করে তথাকথিত ‘জরুরিভিত্তিতে’ কৌশলে অনেক উচ্চদামে নীতির বাইরে ‘রেন্টাল’ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নামক নীতি বিধিবহির্ভূত এক অনৈতিক পন্থায় পাওয়ার স্টেশন বসিয়ে উচ্চদামে বিদ্যুৎ ক্রয়ে আমাদের বাধ্য করছে। এ মাফিয়া চক্রের হাতে জাতি আজ বন্দি বলে জ্বালানি খাতের মতো বিদ্যুৎ খাতের সমস্যারও সমাধান হচ্ছে না।

 

উপসংহার-আমাদেরকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট শেল অয়েল থেকে যে ৫টি গ্যাসক্ষেত্র ক্রয় করেছিলেন তা আজ বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে যুগান্তকারী অবদান রাখছে। জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার সম্পর্কে সকলকে সচেতন হতে হবে। খনিজ সম্পদ ও এর ব্যবস্থাপনা,
ভূতত্ত্ব ইত্যাদি বিষয় নতুন প্রজন্মের কাছে আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের যে সম্পদ রয়েছে তার সময়োপযোগী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

Advertisements

Ainul Islam munna. student.living in Chittagong, Bangladesh. fan of technology, photography, and music.interested in cricket and travel.

Posted in সমালোচনা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

ব্লগ বিভাগ
ব্লগ সংকলন
%d bloggers like this: