চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন পত্র-পত্রিকা

সংবাদপত্র আমাদের দেশের জনপ্রিয় ও প্রধান গণমাধ্যম। বর্তমানে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপক প্রসার ও দাপট এর জনপ্রিয়তা ও প্রভাবকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে নি। বরং দিনে দিনে এর কদর জনসাধারণের কাছে আরো বেড়ে চলেছে। সংবাদপত্রবিহীন জীবন মানুষের কাছে অসহনীয় মনে হয়।

সংবাদপত্রের গুরুত্ব ও প্রভাব সম্পর্কে আবুল কালাম শামসুদ্দীন ঠিকই বলেছেন। তিনি বলেন, সভ্য ও শিক্ষিত মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সংবাদ ও সাহিত্য একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এমন দুনিয়া ও মানুষ সম্পর্কে নেই বা একদিক বাদ দিয়ে অন্যদিকে অগ্রসর হাওয়ার কোন উপায় নেই। দেশ, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র প্রভৃতির উন্নতি, সংস্কার, পরিবর্তন এখন সংবাদ সাহিত্য সাপেক্ষ। সংবাদ সাহিত্য প্রচারের ফলে এখন দল ভাঙে ও গড়ে, নেতৃত্বের হয় উত্থান পতন, দেশ জাতি সম্প্রদায়ের প্রবক্তাদের কথা বিকোয়; এমনকি রাষ্ট্রের  প্রতিষ্ঠা ও পতনও এর উপর অনেকখানি নির্ভর করে থাকে। কাজেই একে বলা হয় চতুর্থ শক্তি।(মাসিক মোহাম্মদী,৮ম সংখ্যা)।

বাংলা অভিভক্ত ভারতে সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্র প্রকাশনার পথিকৃৎ হল জেমস আগাস্টাস হিকি। এই ইংরেজ লোকটি ১৭৮০ সালে ইংরেজি ভাষায় ‘বেঙ্গল গেজেট’ সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। তবে বাংলাদেশে প্রথম ছাপাখানা আবিষ্কার করেন তিনি। ১৭৭৭ সালে তিনি কলকাতায় একটি প্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরের বছর ইউকিলস বাংলা টাইপ তৈরি করেন। বাংলা ভাষায় প্রথম সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় বিদেশীদের হাত ধরে। ক্লার্ক মার্শম্যান শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন থেকে ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে মাসিক ‘দিক দর্শন’ ও ২৩মে তারিখে সাপ্তাহিক ‘সমাচার দর্পণ’ প্রকাশ করেন। রাজা রামমোহন রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ও গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়(১৮৩১)। সম্পাদনায় বাঙালি মালিকানায় ১৮৮১ সালের জুলাই মাসে সাপ্তাহিক ‘বাংলা গেজেট’ প্রকাশিত হয়।

অভিভক্ত বাংলায় পত্র-পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে কলকাতার পরই ছিল চট্টগ্রামের স্থান। এ সময়ে শিক্ষার ক্ষেত্রেও চট্টগ্রাম বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে ছিল। সম্ভবত শিক্ষার সঙ্গে আর্থিক সঙ্গতি যুক্ত হাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম পত্র-পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে  নিজস্ব ঐতিহ্য  সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। ১৮৮২-৮৩ সালে চট্টগ্রাম থেকে কাশিস্বর গুপ্তের সম্পাদনায় মাসিক ‘সংশোধনী’ নামে একটি সাময়িকপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। ‘রাজদূত’ খ্যাত শরৎচন্দ্র দাসের ‘শারদযন্ত্র’ ছাপাখানা থেকে এটি মুদ্রণ করা হতো। চট্টগ্রাম থেকে প্রথম প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকার নাম ‘দৈনিক জ্যোতি’।  এর প্রকাশনার দায়িত্বে ছিল চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেস। চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেস সভাপতি মহিমচন্দ্র দাস পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন। চট্টগ্রামবাসীর পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ শুধু নিজ এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা ঢাকা, কলকাতা, করাচী ও রেঙ্গুন থেকেও সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। মুসলিম বাংলার সাংবাদিকতার জনক হিসেবে খ্যাত মাওলানা মনিরুজ্জামান  ইসলামাবাদী চট্টগ্রামের অধিবাসী। কলকাতা থেকে ১৮৮২ সালে প্রকাশিত ‘মোহামেডান অভজার্ভার’ এর সম্পাদক শাহ্‌ বদিউল আলমও ছিল চট্টগ্রামের অধিবাসী। এই পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে কবি নবীনচন্দ্র সেন, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর হোসেন, বাংলার তদানীন্তন  চীফ সেক্রেটারি হেনরি কটন প্রমুখ তাকে সহযোগিতা করেছিলেন। সুদূর বার্মায় চট্টগ্রামের অধিবাসীরা বাংলা ভাষায় কয়েকটি পত্রিকা বের করেন। ১৯২৩ সালে আবদুল মনেম রেঙ্গুন থেকে ‘সম্মিলনী’ নামের একটি সাপ্তাহিক সাময়িকী বের করেন। পরের বছর  কবি দিদারুল আল ‘যুগের আলো’ নামে অন্য একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯২৯ সালে  ফররোখ আহমদ নেজামপুরির সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ‘বাঙ্গালা গেজেট’।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও শিল্পকলা বিষয়ক শিখামূলক জাদুঘর। স্বাভাবিকভাবে জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য প্রাচীন ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ শিলালিপি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ সংগ্রহের সময়ে আর্কাইভ্যাল ম্যাটেরিয়ালও সংগ্রহ করা হয়। প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত দুষ্প্রাপ্য বাংলা, উর্দু, আরবি ও ফারসি পাণ্ডুলিপি, মূল্যবান দুষ্প্রাপ্য বই ও প্রাচীন পত্রপত্রিকার এক দুর্লভ সংগ্রহ রয়েছে এই জাদুঘরে। এগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। দেশ-বিদেশের বহু গবেষক উচ্চতর গবেষণাকর্মে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত দুষ্প্রাপ্য পত্রিকাসমূহ ব্যাপকভাবে ব্যাবহার করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ-এর অধ্যাপক রিচার্ড ইটন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দি রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দি বেঙ্গল ফ্রান্টিয়ার’ রচনায় এই জাদুঘরের সংরক্ষিত প্রাচীন পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য উপাত্ত ব্যাপকভাবে ব্যাবহার করেছেন।

এই তালিকার বাইরেও আরো বেশ কিছু প্রাচীন পত্রপত্রিকা সংরক্ষিত আছে। তবে অধিকাংশ পত্রপত্রিকা সংগ্রহ সম্পূর্ণ নয়। উল্লেখিত পত্রপত্রিকার অনেকগুলো বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হয়ে একটু সচেতন হলেই এসব দুষ্প্রাপ্য পত্রপত্রিকা রক্ষা করা সম্ভব। এতে করে পাঠক ও গবেষক উভয়েই উপকৃত হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত সাময়িকপত্র ও সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে কয়েকটি দুষ্প্রাপ্য এবং সেগুলো অন্য কোথাও নেই। রেঙ্গুন থেকে প্রকাশিত ‘বাঙ্গালা গেজেট’ এগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি ছিল সাপ্তাহিক সংবাদপত্র। পত্রিকাটির শিরোনামের নিচে ‘ব্রক্ষ্ম প্রবাসী বাঙালীর একমাত্র সাপ্তাহিক মুখপাত্র’ কথাটি ছাপানো থাকত। এর মূল্য ছিল এক আনা। এর সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন ফররোখ আহমদ নেজামপুরী। চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ ব্যাবসায়ী বেঙ্গল বার্মা ন্যাভিগেশন কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আবদুল বারী চৌধুরী এই পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এটি ১৯২৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। তবে কতদিন চালু ছিল তা জানা যায় নি। জাদুঘরে ১জুলাই ১৯২৯ সাল থেকে ২৩জুন ১৯৩০ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত সংখ্যাগুলো  সংরক্ষিত আছে। পত্রিকাটি ছিল অসাম্প্রদায়িক, ব্রিটিশ বিরোধী ও হিন্দু মুসলমান মিলনপন্থি। পত্রিকাটির নীতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়ঃ আমরা দেশে সূদুর অনুমান লক্ষ হিন্দু মুসলমান ও বৌদ্ধ বাঙ্গালী সন্তান। কৃষিশিল্প, বাণিজ্য ও চাকুরী  উপলক্ষে অবস্থান করিতেছি। কিন্তু পরস্পরের সংবাদ আদান-প্রদানের অভাবে কোন সুখ দুঃখের  ভাগী হইতে পারতেছি না। এসব অভাব অভিযোগ পূর্ণ করতে হলে এদেশ হতে আমাদের দেশীয় ভাষায় সংবাদপত্র প্রকাশ করতে হবে।

চবি জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন পত্রপত্রিকার তালিকাঃ

আনন্দবাজার পত্রিকা – কলকাতা – দৈনিক

স্টার অব ইন্ডিয়া  – কলকাতা – দৈনিক

দি স্টেট্‌সম্যান – কলকাতা – দৈনিক

আজাদ – কলকাতা – দৈনিক

বাঙ্গালা গেজেট – রেঙ্গুন – সাপ্তাহিক

প্রবাসী – কলকাতা – মাসিক

নবকল্লোল – কলকাতা – মাসিক

আঙুর – কলকাতা – মাসিক

সওগাত – কলকাতা – মাসিক

বুলবুল – কলকাতা – মাসিক

বাসুমতী – কলকাতা – মাসিক

ভারতবর্ষ – কলকাতা – মাসিক

মাহাম্মদী – কলকাতা – মাসিক

মিল্লাত – কলকাতা – মাসিক

দিলরুবা – কলকাতা – মাসিক

মাহে নও – ঢাকা – মাসিক

পূরবী – চট্টগ্রাম – মাসিক

পাঞ্চজন্য – চট্টগ্রাম – মাসিক

সত্য বার্তা – চট্টগ্রাম – মাসিক

কোহিনূর – চট্টগ্রাম – মাসিক

সীমান্ত – চট্টগ্রাম – মাসিক

জুগ-রবি – চট্টগ্রাম – মাসিক

বৌদ্ধ পত্রিকা – চট্টগ্রাম – মাসিক

গৃহস্থ – কলকাতা- মাসিক

প্রতিধ্বনি – বেনারস – মাসিক

(বাঙ্গালা গেজেট, ১জুলাই, সোমবার ১৯২৯)

এই পত্রিকার সম্পাদক ফররোখ আহমদ নেজামপুরী, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর ভাবশিষ্য ও জাতিয়তাবাদী ছিলেন।  খিলাপত অসহযোগ আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার সম্পাদিত এই পত্রিকায় জাতীয়তাবাদী চিন্তা ধারা প্রকাশ পেয়েছে।

দেশের কৃষিশিল্প, বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় উন্নতি যে উভয় জাতির উপর নির্ভর করছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের সর্বদা মনে রাখতে হবে হিন্দু মুসলমান আমরা একই জাতি এবং এ দেশে আমরা চিরকাল বাস করছি। একই মাঠের শস্য, ফল ও জলবায়ু দ্বারা আমারা জীবন ধারণ করি। আমারা সভ্য জাতি, ভাগ্য দোষে আজ মারা পরাধীন। তবে আমাদের অতীত উজ্জ্বল, গৌরবময়।

এই পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক আবদুল বারী চৌধুরী ও চট্টগ্রামের কতিপয় ব্যাবসায়ী নামে চট্টগ্রাম বার্মা পথে চলাচলের জন্য একটি জাহাজ কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই পত্রিকার জাত, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে সকল বাঙালিকে সুভাষচন্দ্র বসুসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা ব্রিটিশ জাহাজ বয়কট করার আবেদন সমর্থন করে বিবৃতি প্রদান করে।

সুভাষ বসু তার বিবৃতিতে অভিমত প্রকাশ করেন এরকম, চট্টগ্রামের অধিবাসীরা বাঙ্গালী জাহাজ কোম্পানি গঠন করতঃ দেশের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করিতেছেন। তাঁহাদের সাধু প্রচেষ্টা দেশের সামনে বিরাট আদর্শ খাড়া করিবে। ভারতবাসীর নৈশক্তি অর্জনের ইহাই একমাত্র পন্থা।(বাঙ্গালা গেজেত,২৪ আষাঢ়, ১৩৩৬)

প্রাচীন পত্রিকা অমূল্য সম্পদ। আমাদের অবহেলা আর অসচেতনতার অভাবে এ সকল পত্রপত্রিকা আস্তে আস্তে দুষ্প্রাপ্য হয়ে পরছে। অনেক পত্রিকা বিনষ্ট হয়েছে এবং চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জাদুঘর, গ্রন্থাগার ও মহাফেজখানার মাধ্যমে এই সমস্ত প্রাচীন সাময়িক ও সংবাদপত্র সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা বিশেষ প্রয়োজন।

Advertisements

student.living in Chittagong, Bangladesh. fan of technology, photography, and music.interested in cricket and travel.

Posted in প্রিয় লেখা

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

ব্লগ বিভাগ
ব্লগ সংকলন
%d bloggers like this: