২৫ টাকার আমি, কোটি টাকার আমি

( একজন আলোকিত মানুষের সফলতার গল্প)
দারিদ্রপীড়িত পরিবারে জন্ম আমার। বাবা পেশায় একজন দর্জি । দিন আনে দিন খায় এমন অবস্থা। নিদারুন অর্থকষ্টে থাকায় আমার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছিলাম না। বছরে নতুন দুটি কাপড়, দুটি ঈদে শুধুমাত্র মাংস খাওয়া আর সারা বছর নিরামিষে চলছিল আমার জীবন। কষ্ট করে নাইন পাশ করলাম। নাইনে রেজিস্ট্রেশন করার জন্য অনেকগুলো টাকার দরকার ছিল আমার। আম্মু তার সোনার চুড়ি বিক্রয় করলেন। তা দিয়ে আমার বই আর রেজিস্ট্রেশন করালেন। অল্প কিছু টাকা বাচার কারনে সব বই পুরাতন লাইব্রেরী থেকে কিনতে হল। ইংরেজি ২য় পত্র বই সেবার নতুন হওয়া কিনতে পেরেছিলাম না। রেজিস্ট্রেশন করার দিন বাড়িতে এসে দেখি রান্না হয়নি। হবে কি করে? সবগুলো টাকা তো বই আর রেজিস্ট্রেশনে খরচ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন দেখি শুধু আমার জন্য খাবার ছিল। আব্বু, আম্মু না খেয়ে আমার আর আমার ছোট বোনের জন্য চিড়া ভিজিয়ে রেখেছিল। বুঝতে পারিনি তখন!

এভাবে আমার দিন চলছিল। আমার মনে স্বপ্ন ছিল একদিন অনেক অনেক বড় হব। বাবা মার মুখে হাসি ফোটাবো। তাদের কখনও কষ্ট করতে দিব না। এভাবে কষ্ট করে আমার বাবা, মা আমার পড়াশোনার খরচ চালাতে লাগলেন। টাকার অভাবে প্রাইভেট পড়তে পারি না। নিজেই বাড়িতে পড়ি। আমি ক্লাস টেনে উঠে টেস্ট পরীক্ষা দিলাম। টেস্ট পরীক্ষা দেবার পর শুনলাম এসএসসি পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করতে অনেকগুলো টাকা লাগবে। তাই আমি আমার বাড়ির পাশের মাঠে কাজ করতে লাগলাম। ক্ষেতে নিড়ানি দেওয়া, আগাছা পরিস্কার করা। আমার বেতন ছিল 25 টাকা। সারাদিন কাজ করে শরীর ব্যাথা হয়ে যেত। দু-হাতে ফোস্কা পড়ে যেত। কিন্তু পরীক্ষার টাকা জোগার করার আমার কোন উপায় ছিল না। সারাদিন কাজ করে বাড়িতে এসে পড়াশোনা করতাম। সাইন্সে পড়তাম, তাই পড়াশোনা একটু বেশিই করা লাগতো।

এভাবে পরীক্ষার টাকা জোগাড় করলাম। পরীক্ষার দিনে সবাই নতুন জামাকাপড় পরে পরীক্ষা দিতে যায় আর আমি গেলাম আমার সেই পুরাতন জামা-কাপড় পরেই। পরীক্ষার দিন যাওয়ার পথে আমার সেন্ডেল ছিড়ে যাওয়াতে আমি খালি পায়ে পরীক্ষা দিয়ে এসেছি। প্রাইভেট না পড়াতে আমার পরীক্ষার ফল হল 3.0। কিন্তু এই পয়েন্টটা আমার সম্পুর্ণ নিজের চেষ্টায়। কাজ করার কারনে ক্লাস করতে পারিনি, প্রাইভেট পড়তে পারিনি। এই পয়েন্ট আমার কাছে জিপিএ 5। কলেজে ভতি হলাম। নতুন কলেজে গেলে সবাই যায় নতুন জামা-কাপড় পড়ে আর আমি গেলাম কেজির কাপড়ে বানানো জামা পরে। (তখন কেজিতে খুব কম দামে কাপড় পাওয়া যেত।) সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগলো।

ইলেকট্রনিক্সের উপর আমার খুব আগ্রহ ছিল। অংকে আমি খুব ভাল ছিলাম। ক্যালকুলেটর, টিভির রিমোট নিয়ে খুব আগ্রহ ছিল। নতুন কেউ টিভি কিনলে আমাকে ডেকে নিয়ে যেত চ্যানেলগুলো ঠিক করে এনে দিতে। তখন নতুন বাজারে কম্পিউটার এসেছে। আমি স্কুল ছুটির পর দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখতাম। আমার ও ইচ্ছে ছিল কম্পিউটার শেখার। কিন্তু কম্পিউটার শেখার মত টাকা আমার ছিল না। তাই আমি সে ইচ্ছে বাদ দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার আম্মু, যিনি শত অভাবের মধ্যেও আমাদের সংসারটা টিকিয়ে রেখেছিলেন তিনি তার বিয়ের কানের দুল বিক্রি করে আমাকে কম্পিউটার শেখার জন্য টাকা দিলেন।

এর মধ্যে আমি সেই কম্পিউটার সেন্টারে কম্পিউটার শিখতে থাকলাম। পরের মাসের বেতন না দিতে পারায় আমি সেখানে 100 টাকা বেতনে একটা চাকরি নিয়ে নিলাম। আসলে আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল বেতন মওকুফ আর সারাক্ষণ কম্পিউটারের সংস্পশে থাকা। আমি শিখতে থাকলাম, জানতে থাকলাম। 2009 সালের দিকে আমি জানতে পারলাম ইন্টারনেটে আয় করা যায়। আমি তখনও এই ব্যাপারে ভাল করে কোথাও জানতে পারলাম না। আমি শখের বশে বিভিন্ন জিনিস সম্পকে জানতে লাগলাম। আমার ভাল লাগত ওয়েব ডিজাইন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অবসরে নিজের ওয়েবসাইট তৈরি করতে লাগলাম। এর মধ্যে পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম উপজেলা ই-সেন্টারে উদ্দোক্তা নিয়োগ হবে। আমি আবেদন করলাম এবং সেখানে চাকরি পেলাম। সেখানে এসে আমি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রাজিবুল ইসলাম স্যারের সহযোগিতা এবং পরামশে অনলাইনে আয় সম্পকে আগ্রহী হলাম।

এরই মধ্যে আমি খুলনাতে ট্রেনিং এ গেলাম। সেখানে গিয়ে আমি সর্বপ্রথম ওডেস্ক ডট কম এ একটা একাউন্ট খুলি এবং একটি সহজ কাজ পেয়ে যাই। আমি করে ফেলি এবং সেই ক্লায়েন্টের ভাল ফিডব্যাক পাই যা আমার প্রোফাইলে যুক্ত হয়ে যায়। এর পর থেকে আমি আরও কাজ শিখতে থাকি এবং কাজ করতে থাকি। আমার প্রথম মাসের আয় দাড়ায় প্রায় 15 হাজার টাকা। যা আমার জন্য অনেক বড় আয়।

আমি ইংরেজি শিখতে থাকি, ওযেব ডিজাইন, ওয়েব প্রোগ্রামিং শিখতে থাকি। আমার আয় আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। সর্বশেষ আমার অক্টোবর 2012 মাসের আয় প্রায় দুই লক্ষ টাকার ও অধিক।

আস্তে আস্তে আমার ই-মেইল ক্লায়েন্টের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আমি প্রচুর কাজ পেতে থাকি। প্রথম দিকে ওডেস্ক এ কাজ করলেও বর্তমানে প্রাইভেট কোম্পানীতে বেশী কাজ করা হয়। বর্তমানে আমি কানাডাতে MRSFT (Machine Research & Softwere Foundry Limited) কোম্পানীতে চাকুরী করছি। আমার ফিক্সড স্যালারি 1,50,000/= টাকার মত। সেখানে আমাকে প্রতিদিন আট ঘন্টা করে কাজ করতে হয়। এছাড়া আমি আমেরিকার PPM (Perfect Point Marketing) কোম্পানীতে কাজ করি পার্ট টাইম। অস্ট্রোলিয়াতে আমার একটি পার্টনারশীপ মাকেটিং কোম্পানী আছে। তার নাম হল YourMarketingSales (YourMarketingSales.com.au)। তাছাড়া বিভিন্ন ছোটখাট কাজ তো করতেই হয়।

আমি আমার অস্ট্রোলিয়ান পার্টনারের কাছ থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার অফার পেয়েছি। কিন্তু আমি সেখানে যেতে চাই না। আমি আমার দেশকে অনেক অনেক ভালবাসি। এদেশের আবহাওয়া, সুযোগ-সুবিধায় বড় হয়ে আমি বাইরে চলে গিয়ে নিজেকে বেঈমান প্রমাণিত করতে চাই না। আমি আমার দেশকে অনেক উচুতে নিয়ে যাবো। আমি রাসেল আহমেদ, আমিই বাংলাদেশ।

অনেক কাজ হওয়ার কারনে আমি, আমার অন্যান্য পার্টনার মিলে তৈরি করেছি DesinigngWay নামে একটি কোম্পানী। আমরা প্রায় 78-80 জন এখানে কর্মরত। এখানে ফিলিপাইন, কানাডা, আমেরিকাসহি বিভিন্ন দেশের ওয়ার্কাররা কাজ করে। আমাদের এই কোম্পানীর গত মাসের ইনকাম প্রায় 50 লক্ষ টাকা। আমাদের পরবর্তী ছয় মাসের টাগেট প্রতি মাসে 1 কোটি টাকা আয় করা।

কোম্পানীতে আমার প্রোফাইলের পাশে আমার জন্মভূমি, আমার বাংলাদেশের ছবি লাল-সবুজে আকা। আমি গর্ববোধ করি আমি বাংলাদেশী। এত সীমাবদ্ধতা থাকার পরও আমি আমার কোম্পানীতে বাংলাদেশী ওয়ার্কার বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

আমি খুব ছোট থেকে বড় হয়েছি। তাই যারা সুযোগসুবিধা বঞ্চিতদের প্রতি আমার আলাদা একটা মমত্ববোধ আছে। ইতিমধ্যেই আমি ট্রেনিং দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে 100+ জনকে কর্মক্ষম করেছি। যাদের কেউ কেউ আমার সাথে কাজ করে আবার কেউ কেউ আলাদা কাজ করে। শহরে না গিয়ে আমি গ্রামকে বেছে নিয়েছি। কারন, আমি মনে করি গ্রাম থেকেই উন্নতি সম্ভব। গ্রামে ইন্টারনেটের অপ্রতুলতা থাকা সত্বেও। কারণ, এখানে আবহাওয়া ভালো, কোন বিরক্তিকর শব্দ, কোলাহল নেই। যাতায়াত এর জন্য ট্রাফিক জ্যাম নেই। আরও অনেক। ধন্যবাদ মাননীয় তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু স্যারকে। তিনি আমাদের জন্য ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এনে দেবার জন্য অনেক সাহায্য করেছেন।

সবাই যাতে অনলাইনে যে কোন স্থান থেকে এইসব কাজ শিখতে পারি সেজন্য আমি আর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিলে তৈরি করেছি আর.আর. ফাউন্ডেশন। এই সাইটের মাধ্যমে যে কেউ যে কোন স্থান থেকে আউটসোসিং শিখতে পারবেন। আমাদের তৈরি ভিডিও টিউটোরিয়ালগুলো খুব সহজ ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে।

বর্তমানে আউটসোসিং এর জন্য অনেকগুলো বাধা রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান সমস্যাটি হল ইন্টারনেটের স্পীড। কাজ করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ইন্টারনেটের স্পীড। সরকার যদি এদিকে একটু নজর দেয় তাহলে অনেক ভালো হবে। এছাড়া পেপ্যাল সমস্যা, বিদুৎ সমস্যা তো আছেই।

প্রয়োজন প্রচুর পরিমানে ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। আমি নিজে একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট চালাই। যেখানে অল্প খরচে/বিনামূল্যে আউটসোসিং ট্রেনিং দেওয়া হয়। আমার একটি ভাল স্থান/কম্পিউটার ল্যাব প্রয়োজন। আমি তৈরি করছি আমার বাড়িতে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে আমার অফিস/ট্রেনিং ইনস্টিটিউট উদ্বোধন করে কাজ শুরু করব।

পরিশেষে, গ্রাম থেকে উন্নতি সম্ভব হলে শহর কেন?

আরও জানতেঃ #www.rrfoundation.net
facebook Group: #https://www.facebook.com/groups/rrfkstbd

Advertisements

Ainul Islam munna. student.living in Chittagong, Bangladesh. fan of technology, photography, and music.interested in cricket and travel.

Posted in জীবনী

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

ব্লগ বিভাগ
ব্লগ সংকলন
%d bloggers like this: