ছড়িয়ে পড়ছে ‘জায়ান্ট মিলিবাগ’

আফ্রিকান পোকা ‘জায়ান্ট মিলিবাগ’ বিভিন্ন ধরনের রোগ ছড়াতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ পোকা মানুষের মধ্যে চুলকানি, ফোস্কা পড়া, এলার্জি, শ্বাসকষ্ট ও চোখ ওঠাসহ বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। এ ছাড়া উদ্ভিদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে রোগীর পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে। বেশির ভাগ রোগীই ডায়রিয়া, আমাশয়, সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত। তবে এটা পোকার আক্রমণে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারছেন না ডাক্তাররা। রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের আশপাশে এ পোকার আবির্ভাব প্রথমে দেখা গেলেও বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) হল, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, খামারবাড়ির ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা, সংসদ ভবন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এ পোকা কিভাবে এ দেশে এসেছে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে পোকাটি সুদূর আফ্রিকা থেকে এসেছে- এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন তারা। কেউ বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে এসেছে।

আফ্রিকা থেকে কাঠসহ বিভিন্ন বস্তু আমদানি করা হয়ে থাকে। এ পোকার আতঙ্কে রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ পোকার রোগ বহন ক্ষমতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকলেও এ পোকার নিধন সম্পর্কে তারা একমত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রবীণ একজন অধ্যাপক বলেছেন, এ পোকা বিভিন্ন রোগ বহন করতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মেডিকেল সেন্টারের প্রধান মেডিকেল অফিসার বলেছেন, এ পোকার রোগবহন ক্ষমতা সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রথমে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের বিভিন্ন গাছপালায় দেখা গেলেও এক সপ্তাহ ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল, স্যার এ এফ রহমান হল, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল, রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ ও ঢাকা কলেজসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার গাছপালায় জায়ান্ট মিলিবাগ দেখা যাচ্ছে। দেশের অন্যান্য স্থানেও এ পোকার আক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের বিছানায় পর্যন্ত ছড়িয়েছে এ পোকা। সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের মাস্টার্সের ছাত্র মিজান বলেন, আমার রুমের ভেতর পোকা পাওয়া গেছে। বিছানাতেও পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া কাপড়-চোপড়েও এ পোকা পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি জানান। মিজান বলেন, হলের কাঁঠালগাছে এ পোকা দেখা গেছে। কাঁঠাল নষ্ট করে ফেলেছে। তিনি বলেন, আমরা একপ্রকার আতঙ্কের মধ্যে আছি। বিশেষজ্ঞরা জানান, আফ্রিকান পোকা ‘জায়ান্ট মিলিবাগ’ চুলকানি, ফোস্কা পড়া, এলার্জি, শ্বাসকষ্ট ও চোখ ওঠাসহ বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। পোকার আতঙ্কে ২৬শে এপ্রিল পর্যন্ত কলেজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে এ পোকা আমাদের জন্য আতঙ্ক নয়। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য এটা আতঙ্ক হতে পারে। তাই দ্রুত এ পোকার বৃদ্ধি ও অবস্থান থামাতে হবে। এ পোকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি একই সময়ে একাধিক ডিম ও বাচ্চা দিতে পারে। এ পোকার প্রতিটি থলেতে ২০০-৩০০ ডিম থাকে। পোকাগুলো ১ সে.মি বা তার অধিক লম্বা এবং ডিম্বাকৃতির। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও বয়স্ক পোকা আম, কাঁঠাল, পেঁপে, রেইনন্ট্রি, লেবুজাতীয় ফলদ উদ্ভিদে আক্রমণ করে। বিশেষজ্ঞরা জানান, এটা মানুষের জন্য সরাসরি বড় ধরনের ক্ষতির কারণ না হলেও কিছু কিছু উদ্ভিদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এ পোকা উদ্ভিদের কচিপাতা, নতুন শাখা, ফুলের কুঁড়ি এবং ফলের রস চুষে খায়। যায় ফলে আক্রান্ত গাছটি নিস্তেজ হয়ে মায়া যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি বিশেষজ্ঞ দল পোকার আবির্ভাব ও রোগ বহনের ক্ষমতা খতিয়ে দেখছে। বিশেষজ্ঞ দল একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কাপড়-চোপড় ও বস্তাজাতীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে এ পোকা সুদূর আফ্রিকা থেকে এসেছে। কিছুদিন ধরে ধরে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষক-ছাত্রীরা এদের নিয়ে মহাঝামেলায় আছে। একটি নয়, দু’টি নয়- লাখ লাখ পোকা। কলেজের বিশাল রেইনট্রিসহ বিভিন্ন গাছ সম্পূর্ণ তাদের দখলে। সেখান থেকে হেঁটে করিডর, ক্লাসরুম, শিক্ষকদের কক্ষ, আবাসিক এলাকার অন্যসব গাছে সবদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কামড়ায় না কাউকে, তবে তাদের গায়ের ধুলায় (পাউডার) চুলকানি, ফোস্কা পড়া, এলার্জি, শ্বাসকষ্ট হয়। আম, জাম, কাঁঠাল, নারিকেলের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। তারা ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, বেইলি স্কোয়ার অফিসার্স কোয়ার্টারে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ পোকা যে পরিবেশে বাস করে বাংলাদেশে সে তাপমাত্রা নেই। এ ছাড়া বেশ কিছুদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে না। তারা ডিম ও বাচ্চা দিতে মাটিতে নেমে এসেছে। যার কারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া আফ্রিকার সঙ্গে বাংলাদেশের রাত-দিনের পার্থক্য রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল বাশার বলেন, এ পোকা নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলছেন। আমি নিজে হাতে লাগিয়ে দেখেছি সঙ্গে সঙ্গে হাত লাল হয়ে গেছে। এ পোকার গায়ে অসংখ্য আঁশ রয়েছে। এটা চোখে পড়লে চোখ আক্রান্ত হতে পারে। এ ছাড়া অন্যান্য রোগও ছড়াতে পারে। আমরা এ পোকার ক্ষমতা সম্পর্কে জানি না। অতীতে এ ধরনের পোকা নিয়ে আমরা কাজ করিনি। তিনি বলেন, দ্রুত এ পোকা থামাতে হবে। পানি দিতে হবে নয়তো মাটিতে পুঁতে পুড়িয়ে দিতে হবে। অধ্যাপক আবুল বাশার জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অ্যারাকনিড জাতীয় পোকা ধ্বংসের পদক্ষেপ না নিলে এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কীটনাশক ব্যবহার করে কোন ফল পাওয়া যাবে না। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত এর বংশবিস্তার অব্যাহত থাকবে। এ কারণে প্রচুর পরিমাণে পানি ছিটিয়ে এক জায়গায় জড়ো করে পোকাগুলোকে মাটিতে পুঁতে ফলতে হবে। তিনি জানান, অ্যারাকনিড জাতীয় এ পোকার আবাস্থল আফ্রিকান দেশগুলোতে, যেখানকার আবহাওয়া গরম। বিশেষ করে কঙ্গোতে এ পোকার সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। সামপ্রতিক সময়ে এটি বাংলাদেশে এসেছে। এ পোকার আকৃতি অনেকটা তেলাপোকার বাচ্চার মতো। গায়ের রঙ মেটে। দেখতে বিদঘুটে। যে চারটি স্তর (ডিম, লারভা, পিউপা ও অ্যাডাল্ট) অতিক্রম করে বিভিন্ন পোকার বংশবিস্তার হয়, অ্যারাকনিড সেটা অতিক্রম করে না। এ কারণে ডিম থেকে ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ডিম দেয়া শুরু করে। অ্যাকারে প্রজাতির সব পোকাই জীবাণু বহন করে জানিয়ে প্রাণিবিজ্ঞান গবেষক ড. আবুল বাশার আরও বলেন, এটা দেশীয় পোকা না হওয়ায় এখন পর্যন্ত এ নিয়ে দেশে তেমন কোন গবেষণা হয়নি। তিনি বলেন, এর পেটে এক ধরনের সাদা তরল পদার্থ থাকে, যা মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রজ্জব আলী জানান, কার্বোসালফান কিংবা কনফিডার স্প্রে করলে আক্রান্ত গাছকে রক্ষা করা যাবে। তিনি জানান, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পোকাগুলো মাটির নিচে অবস্থিত ডিম থেকে ফুটে বের হয়ে খাবারের জন্য আশপাশের পোষক গাছের কচিপাতা, নতুন শাখা, কা-, ফুলের কুঁড়ি প্রভৃতিতে অবস্থান করে। এ অবস্থায় পোকাগুলো মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত আক্রান্ত গাছ থেকে খাবার সংগ্রহ করে জীবন ধারণ করে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক অবস্থায় পৌঁছে। এরপর মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পোকাগুলো পূর্ণ বয়স্ক হয়ে ডিমপাড়ার জন্য উপযোগী জায়গার খোঁজে মাটিতে নেমে আসে। তারা সাধারণত মাটির নিচে ডিম পারে। গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ চত্বর সম্পূর্ণ পিচঢালা থাকায় পোকাগুলো ডিমপাড়া জন্য মাটি খুঁজে না পেয়ে এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছে। রজব আলী বলেন, আক্রান্ত গাছের চারপাশ গর্ত করে কেরোসিনমিশ্র পানি দিয়ে রাখলে পোকাগুলো নামার সঙ্গে সঙ্গে মারা যেতে পারে। পোকার প্রতিকার সম্পর্কে রজ্জব আলী জানান, প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত গাছে কীটনাশক যেমন- কার্বোসালফান প্রতি লিটার পানিতে ৩ মিলি লিটার অথবা কনফিডার প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি লিটার স্প্রে করতে হবে। পোকার আতঙ্ক নিয়ে রোববার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সংবাদ সম্মেলন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারের চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. এ কে এম আবদুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, জায়ান্ট মিলিবাগ কি ধরনের রোগ ছড়াতে পারে তা সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অন্ধকারে রয়েছি। এর আগে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করিনি। তিনি বলেন, গত কয়েক দিনে মেডিকেল সেন্টারে রোগীর পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আমরা চেষ্টা করছি যতদ্রুত সম্ভব এর প্রতিকার করতে।

Advertisements

Ainul Islam munna. student.living in Chittagong, Bangladesh. fan of technology, photography, and music.interested in cricket and travel.

Posted in কপি-পেস্ট

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

ব্লগ বিভাগ
ব্লগ সংকলন
%d bloggers like this: